‘কালীকে তুললেই সব বেরোবে’, শুভেন্দুর মন্তব্যের রাতেই তারাতলা বিপর্যয় কাণ্ডে গ্রেফতার ফিরহাদের প্রাক্তন OSD কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
এক নজরে
- তদন্তে আরও কয়েকজন আধিকারিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে সূত্রের দাবি।
- তারাতলা বিপর্যয়ের তদন্তে গ্রেফতার কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
- তিনি কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের প্রাক্তন OSD ছিলেন।
- বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত নথি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখছে SIT।
- বিধানসভায় কালীচরণ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
কলকাতা: তারাতলা বিপর্যয়ের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)। বৃহস্পতিবার রাতেই গ্রেফতার করা হয়েছে কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের প্রাক্তন অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি (OSD) কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত নথি, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সূত্র ধরেই এই গ্রেফতারি। যদিও তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে আইনত দোষী বলা যায় না।
বিধানসভায় কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য
বৃহস্পতিবার বিধানসভায় তারাতলা বিপর্যয় নিয়ে আলোচনার সময় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রাক্তন পুরবোর্ডকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট বিল্ডিংয়ের অনুমোদনের নথিতে প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের স্বাক্ষর রয়েছে। এরপরই তিনি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “কালীকে তুললেই সব বেরিয়ে যাবে। ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশেই ওকে নিয়োগ করা হয়েছিল। কলকাতার এমন কোনও বিল্ডিং নেই, যার সম্পর্কে কালী জানে না।”
এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই SIT কালীচরণকে গ্রেফতার করায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। বিরোধীরা এই ঘটনাকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে দাবি করলেও, বিষয়টি নিয়ে শাসক শিবিরের তরফে এখনও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।
প্রশাসনিক জীবন থেকে পুরসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে
কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মজীবন শুরু থেকেই ছিল নজরকাড়া। ২০০৩ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস (WBCS) পরীক্ষায় রাজ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে তিনি ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দফতরে যোগ দেন। পরে ২০০৬ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিস (WBPS) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং ২০০৮ সালে রাজ্য পুলিশে যোগ দেন। তবে প্রশিক্ষণ চলাকালীন বিশেষ কারণে সেই চাকরি ছেড়ে পুনরায় ভূমি রাজস্ব দফতরে ফিরে আসেন।
সূত্রের খবর, ২০১০ সালের পর কলকাতা পুরসভায় তাঁর দায়িত্ব শুরু হয়। সেই সময় ফিরহাদ হাকিম মেয়র পারিষদ ছিলেন। পরে ফিরহাদ হাকিম মেয়র হওয়ার পর কালীচরণকে তাঁর OSD হিসেবে নিয়োগ করা হয় বলে প্রশাসনিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল।
পুরসভার সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ছিল?
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, বিল্ডিংয়ের নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে কালীচরণের প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশি। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, পুরসভার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁর মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। এমনকি প্রশাসনিক মহলের একাংশের দাবি, তাঁর প্রভাবের কারণে বহু কাউন্সিলর ও আধিকারিক প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চাইতেন না।
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে সাক্ষাতের ক্ষেত্রেও অনেক সময় কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলে আসছে। তবে এই দাবির বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য সামনে আসেনি।
তদন্তের পরবর্তী ধাপের দিকে নজর
তারাতলায় বেআইনি গুদামঘরের ছাদ ধসে প্রাণহানির ঘটনায় ইতিমধ্যেই SIT একাধিক নথি, অনুমোদন সংক্রান্ত ফাইল এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে। গ্রেফতারের পর তদন্তের পরবর্তী ধাপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে। তদন্তকারীরা এখন তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজন প্রাক্তন ও বর্তমান আধিকারিককে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন বলেও সূত্রের ইঙ্গিত।
এই গ্রেফতারির ফলে শুধু তারাতলা বিপর্যয়ের তদন্তই নয়, কলকাতা পুরসভার অতীতের বিল্ডিং অনুমোদন প্রক্রিয়াও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আগামী দিনে SIT-এর তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।
