দেশ

ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে প্রযুক্তিনির্ভর! অবসরের আগে বড় বার্তা সেনাপ্রধান দ্বিবেদীর

বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে দেশের প্রতিরক্ষা কৌশল, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধের ধরন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আগামী দিনের যুদ্ধ হবে আরও দ্রুতগতির, প্রযুক্তিনির্ভর এবং তথ্যভিত্তিক। তাঁর মতে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু অস্ত্রের শক্তি নয়, গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি, তিন বাহিনীর সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠবে।

‘অপারেশন সিঁদুর’ ভারতের সক্ষমতার প্রমাণ

সেনাপ্রধানের মতে, ‘অপারেশন সিঁদুর’ ছিল ভারতের “সংকল্প, সক্ষমতা এবং সংযম”-এর এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি বলেন, বিশ্বের বহু সংঘাত যেখানে মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর ধরে চলেছে, সেখানে ভারতীয় সেনা মাত্র ৮৮ ঘণ্টার মধ্যেই নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে।

জেনারেল দ্বিবেদীর বক্তব্য, এই অভিযানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল, নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য, উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা, সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং তিন বাহিনীর সমন্বিত পরিকল্পনা একসঙ্গে কাজ করলে অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যেও কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধে প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক নজরদারির আওতায় থাকবে। তাই প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি তথ্য ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন

বাতিল পুরনো তালিকা! বাংলায় OBC ক্যাটেগরিতে এবার কত সম্প্রদায়?

আধুনিক হচ্ছে ভারতীয় সেনার কাঠামো

সেনাপ্রধান জানান, ভারতীয় সেনার আধুনিকীকরণ এখন আর শুধু নতুন অস্ত্র বা যুদ্ধ সরঞ্জাম কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেনার কাঠামো, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, মানবসম্পদ, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং যুদ্ধনীতি, সব ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

এই রূপান্তরের অংশ হিসেবেই সেনাবাহিনীতে যুক্ত হচ্ছে ‘রুদ্র ব্রিগেড’, ‘ভৈরব ব্যাটালিয়ন’, ‘অশনি ড্রোন প্লাটুন’, ‘শক্তিবাণ রেজিমেন্ট’ এবং ‘দিব্যাস্ত্র ব্যাটারি’। সেনাপ্রধানের কথায়, এই নতুন ইউনিটগুলি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাকে আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং কার্যকর করে তুলবে।

ড্রোন যুদ্ধেই বাড়ছে জোর

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ড্রোনের গুরুত্ব উল্লেখ করে জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, ড্রোন এখন শুধু নজরদারির জন্য নয়, লক্ষ্য চিহ্নিতকরণ, নির্ভুল হামলা, রসদ সরবরাহ, যুদ্ধক্ষেত্রের মূল্যায়ন এবং সেনা সুরক্ষার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এই কারণেই ভারতীয় সেনা একটি পূর্ণাঙ্গ ড্রোন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে ড্রোন উৎপাদন, প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, অপারেশনাল নীতি এবং সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে ড্রোন প্রযুক্তির সমন্বয়, সব ক্ষেত্রেই জোর দেওয়া হচ্ছে।

‘বাজ ব্যাটালিয়ন’ ও অ্যান্টি-ড্রোন হাব

ড্রোন পরিচালনার সক্ষমতা আরও বাড়াতে তৈরি করা হচ্ছে ‘বাজ ব্যাটালিয়ন’। এই বিশেষ ইউনিটের কাজ হবে আকাশপথে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি, দ্রুত তথ্য সংগ্রহ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কমান্ডারদের বাস্তবসম্মত পরিস্থিতির ছবি পৌঁছে দেওয়া।

একই সঙ্গে শত্রুপক্ষের ড্রোন মোকাবিলায় সেনার বিভিন্ন ঘাঁটিতে গড়ে তোলা হয়েছে বিশেষ ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন হাব। সেন্সর, রাডার, ক্যামেরা, জ্যামার এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রু ড্রোন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।

‘অগ্নিপথ’ নিয়ে কী বললেন সেনাপ্রধান?

অগ্নিপথ প্রকল্প প্রসঙ্গে জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য সেনাবাহিনীকে আরও তরুণ, ফিট এবং প্রযুক্তি-সক্ষম করে তোলা। তাঁর দাবি, অগ্নিবীররা খুব দ্রুত সেনার প্রশিক্ষণ ও কাজের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন।

তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন যে, প্রথম ব্যাচের অগ্নিবীরদের সম্পূর্ণ পরিষেবা মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি। তাই এই মুহূর্তে প্রকল্পের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। ভবিষ্যতে কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে তা সেনার বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতেই করা হবে।

এলএসি পরিস্থিতি নিয়ে আশ্বস্ত করলেন সেনাপ্রধান

চিনের সঙ্গে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC) প্রসঙ্গে সেনাপ্রধান বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেও তা এখনও সংবেদনশীল। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা, স্থানীয় সমস্যার সমাধান সংলাপের মাধ্যমে করা এবং প্রয়োজনে শক্তিশালী মোতায়েন বজায় রাখা, এই তিনটিকেই ভারতীয় সেনার প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর বক্তব্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু সাহস বা অস্ত্রশক্তি নয়, প্রযুক্তি, তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই নির্ধারণ করবে কোনও দেশের সামরিক সাফল্য। সেই লক্ষ্যেই ভারতীয় সেনা নিজেদের নতুন যুগের জন্য প্রস্তুত করছে

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু সীমান্তে সেনা মোতায়েন বা প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সাইবার সক্ষমতা, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিয়েল-টাইম নজরদারি এবং দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নেবে। সেই কারণেই ভারতীয় সেনা এখন প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো গড়ে তোলার দিকে বেশি জোর দিচ্ছে।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *