‘বিচার প্রক্রিয়া বিনোদন নয়’, এজলাসের অডিও-ভিডিও প্রচার নিয়ে এল সুপ্রিম নির্দেশ
আদালতের অনুমতি ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়ার অডিয়ো বা ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে পোস্ট, সম্পাদনা কিংবা পুনঃপ্রচার করা যাবে না। এমন রেকর্ডিং থেকে অর্থ উপার্জনেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার একটি জনস্বার্থ মামলায় এই অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ।
শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করেছে, এই নির্দেশ সংবাদমাধ্যমে আদালতের কার্যক্রমের যথাযথ প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করবে না। নিষেধাজ্ঞা মূলত শুনানির অডিয়ো-ভিডিয়ো অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ, পরিবর্তন কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কোন কোন কাজে নিষেধাজ্ঞা?
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, বিচারপ্রক্রিয়ার অডিয়ো বা ভিডিয়ো অনুমতি ছাড়া—
রেকর্ড বা আলাদা অংশ সংগ্রহ করা যাবে না;
কেটে বা পরিবর্তন করে পোস্ট করা যাবে না;
সমাজমাধ্যম ও অন্য ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়ানো যাবে না;
পুনরায় আপলোড বা প্রচার করা যাবে না;
বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার কিংবা তা থেকে অর্থ উপার্জন করা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্টের শুনানির রেকর্ডিং ব্যবহারের জন্য আদালতের সেক্রেটারি জেনারেলের আগাম অনুমতি প্রয়োজন হবে। কোনও হাই কোর্টের কার্যক্রম হলে সংশ্লিষ্ট হাই কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের অনুমোদন নিতে হবে।
‘আদালত ২৪ ঘণ্টার বিনোদনের মাধ্যম নয়’
শুনানির নির্বাচিত অংশ কেটে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, আদালতের কার্যক্রমকে সারাক্ষণের বিনোদনে পরিণত করা যায় না। তাঁর মতে, কোনও অডিয়ো বা ভিডিয়ো একবার উন্মুক্ত ডিজিটাল পরিসরে পৌঁছে গেলে তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে, কোনও শুনানির ছোট অংশ মূল প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ছড়ানো হলে বিচারক বা আইনজীবীর বক্তব্য সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। সম্পাদিত ভিডিয়োয় নতুন কথা বা দৃশ্য যুক্ত করার আশঙ্কাও শুনানিতে উঠে আসে।
কেন সুপ্রিম কোর্টে মামলা?
সাংবাদিক হর্ষিতা গ্রোভারের দায়ের করা জনস্বার্থ মামলায় আদালতের সরাসরি সম্প্রচার থেকে ভিডিয়োর অংশ কেটে প্রচার, পরিবর্তন এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য নিয়ন্ত্রণবিধি চাওয়া হয়েছে। মামলাকারীর বক্তব্য, প্রসঙ্গবিহীন বা নির্বাচিত অংশ প্রচার করা হলে বিচারপ্রক্রিয়ার বক্তব্য বিকৃত হতে পারে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মামলাকারীর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ সিংহ জানান, আদালতের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করায় তাঁর আপত্তি নেই। তাঁর উদ্বেগ মূলত সম্প্রচারিত ভিডিয়োর অংশ কেটে বিভ্রান্তিকরভাবে সমাজমাধ্যমে ব্যবহার করা নিয়ে।
সরাসরি সম্প্রচারও পর্যালোচনার মুখে
সুপ্রিম কোর্ট সব হাই কোর্টকে মামলার পক্ষ করেছে। আদালতের সরাসরি সম্প্রচার সংক্রান্ত আদর্শ নিয়মগুলি কতটা কার্যকর হয়েছে এবং একটানা সম্প্রচারের কী প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে হাই কোর্টগুলির কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারকেও প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করার জন্য কোন মন্ত্রক বা বিভাগ দায়িত্ব নেবে, তা পরীক্ষা করে জানাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি মেটা ও এক্স-সহ সংশ্লিষ্ট সমাজমাধ্যম সংস্থাগুলিকে নোটিস দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ প্রকাশ কি বন্ধ হয়ে গেল?
না। আদালতের নির্দেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়ার সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশে এর কোনও প্রভাব পড়বে না। সাংবাদিকেরা শুনানির তথ্যের ভিত্তিতে নির্ভুল সংবাদ লিখতে পারবেন। তবে আদালতের অডিয়ো বা ভিডিয়ো ক্লিপ সরাসরি ব্যবহার, সম্পাদনা কিংবা সমাজমাধ্যমে পুনঃপ্রচারের আগে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন হবে।
মামলাটির পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্র, হাই কোর্ট এবং সমাজমাধ্যম সংস্থাগুলির বক্তব্য শোনার পর সুপ্রিম কোর্ট স্থায়ী নির্দেশিকা জারি করবে কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে।
