সিন্ধু ঐতিহ্য বনাম সামরিক নামকরণ, পাকিস্তানের ইতিহাসচর্চা নিয়ে নতুন বিতর্ক
নয়াদিল্লি: সিন্ধু জল চুক্তি ঘিরে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হওয়ার পর প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা আবার সামনে এসেছে। পাকিস্তান সাম্প্রতিক সময়ে হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, ট্যাক্সিলা এবং গন্ধার ঐতিহ্যকে নিজের ঐতিহাসিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু এই প্রচেষ্টার মাঝেই পাকিস্তানের সামরিক নামকরণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠছে।
কারণ পাকিস্তানের একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের নাম এমন ঐতিহাসিক শাসকদের নামে রাখা হয়েছে, যাঁদের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশে সামরিক অভিযান, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক দখলের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে গজনভি, ঘৌরি, বাবর, আবদালি এবং তৈমুরের মতো নাম।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, একদিকে প্রাচীন সিন্ধু-গন্ধার ঐতিহ্যকে সামনে আনা এবং অন্যদিকে মধ্যযুগীয় সামরিক জয়ের প্রতীকী নাম ধরে রাখা—এই দুই অবস্থানের মধ্যে একটি স্পষ্ট টানাপোড়েন রয়েছে।
সিন্ধু ঐতিহ্য কেন আলোচনায়?
সিন্ধু সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বর্তমান পাকিস্তানের ভূখণ্ডে অবস্থিত। মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা এবং ট্যাক্সিলা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, মহেঞ্জোদারো ছিল সিন্ধু উপত্যকার একটি সুপরিকল্পিত প্রাচীন নগরকেন্দ্র। এটি দক্ষিণ এশিয়ার নগরায়ণের ইতিহাসে বড় গুরুত্ব বহন করে। তবে সিন্ধু সভ্যতার বিস্তার শুধু বর্তমান পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বর্তমান ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলেও এই সভ্যতার বহু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন পাওয়া যায়। তাই এই ঐতিহ্যকে একক রাষ্ট্রীয় মালিকানার বদলে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর সভ্যতার অংশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
পাকিস্তানের ইতিহাসচর্চায় দ্বন্দ্ব কোথায়?
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসচর্চায় দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি পরিচয়কে কেন্দ্রীয় জায়গা দেওয়া হয়েছে। মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযানকে অনেক সময় পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সূচনা হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পাকিস্তানের ভূখণ্ডের ইতিহাস তার বহু আগের। সিন্ধু সভ্যতা, গন্ধার, বৌদ্ধ ঐতিহ্য, জৈন ও অন্যান্য প্রাচীন সাংস্কৃতিক ধারা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল বহুস্তরীয় ইতিহাসের অংশ। এই কারণেই এখন প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তান যদি প্রাক-ইসলামিক ঐতিহ্যকে নিজের জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে সামনে আনে, তাহলে সামরিক প্রতীকে তার প্রতিফলন কতটা রয়েছে?
কোন কোন নাম নিয়ে প্রশ্ন?
পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র তালিকায় আবদালি, গজনভি, ঘৌরি, বাবর, নসর, শাহীন, রা’আদ—সহ একাধিক নাম দেখা যায়। এর মধ্যে কয়েকটি নাম সরাসরি মধ্যযুগীয় শাসক বা সামরিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।
গজনভি নামটি মাহমুদ গজনির সঙ্গে যুক্ত বলে ধরা হয়। তিনি ১১ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশে একাধিক সামরিক অভিযানের জন্য ইতিহাসে পরিচিত।
ঘৌরি নামটি মুহাম্মদ ঘোরির সঙ্গে যুক্ত। তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের পর উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে।
বাবর ছিলেন মধ্য এশীয় শাসক। ১৫২৬ সালের পানিপথের যুদ্ধের পর ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি তৈরি হয়।
আবদালি নামটি আহমদ শাহ আবদালির সঙ্গে যুক্ত। ১৮ শতকে উত্তর ভারতে তাঁর সামরিক অভিযান ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
তৈমুরও ১৩৯৮ সালে দিল্লি অভিযানের জন্য ইতিহাসে পরিচিত।
এই নামগুলির সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন সিন্ধু বা গন্ধার ঐতিহ্যের সরাসরি সম্পর্ক নেই। এখানেই বিতর্কের মূল জায়গা।
শুধু অস্ত্র নয়, প্রতীকের ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ
কোনও দেশ তার সামরিক সরঞ্জামের নাম ইতিহাস, পুরাণ, ভাষা বা জাতীয় স্মৃতি থেকে নিতে পারে। এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু নামকরণ কখনও কখনও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কল্পনা ও পরিচয়ের ইঙ্গিত দেয়। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বহু সামরিক নাম এসেছে আরবি, পারসি, আফগান বা মধ্য এশীয় ঐতিহাসিক পরিসর থেকে। এর বিপরীতে সিন্ধু, গন্ধার বা স্থানীয় প্রাক-ইসলামিক ঐতিহ্য সামরিক নামকরণে খুব বেশি দেখা যায় না।
এই কারণেই প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে কোন ইতিহাস বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? বর্তমান ভূখণ্ডের বহু হাজার বছরের সভ্যতা, নাকি মধ্যযুগীয় সামরিক জয়ের স্মৃতি?
সাম্প্রতিক বিতর্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের ভিতরেও এই প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা দেখা যাচ্ছে। একাংশ বলছে, পাকিস্তানের ইতিহাসকে শুধু ৭১২ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে দেখা ঠিক নয়। বর্তমান পাকিস্তানের ভূখণ্ডে সিন্ধু সভ্যতা, গন্ধার, বৌদ্ধ ঐতিহ্য এবং আরও বহু প্রাচীন সাংস্কৃতিক ধারা রয়েছে। এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রীয় ইতিহাসচর্চা শুধু অতীত বোঝার বিষয় নয়। তা শিক্ষা, সংস্কৃতি, কূটনীতি এবং সামরিক প্রতীকের ভাষাকেও প্রভাবিত করে।
অস্ত্রের নাম বদলাবে কি পাকিস্তান?
এখনই সেই সম্ভাবনা খুব কম। কারণ কৌশলগত অস্ত্রের নামকরণ সাধারণত সামরিক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামোয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই বেসামরিক স্তরে ইতিহাস নিয়ে নতুন আলোচনা হলেও, সামরিক নামকরণ বদলানো সহজ নয়। তাছাড়া এই নামগুলি দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের সামরিক পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। ভারতকে প্রধান নিরাপত্তা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার প্রেক্ষাপটে এই নামগুলির প্রতীকী গুরুত্বও তৈরি হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে তুলনা কেন আসছে?
অনেক দেশ নিজেদের অস্ত্রের নাম স্থানীয় ইতিহাস, ভাষা বা সাংস্কৃতিক স্মৃতি থেকে নেয়। ভারতের ক্ষেত্রে অগ্নি, পৃথ্বী, আকাশ, তেজস বা অর্জুনের মতো নাম দেখা যায়। এগুলি ভারতীয় ভাষা, পুরাণ বা সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে নেওয়া। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে নামের বড় অংশ এসেছে মধ্য এশীয় বা আফগান-ইসলামি ইতিহাস থেকে। তাই প্রশ্ন উঠছে, যদি পাকিস্তান সত্যিই সিন্ধু-গন্ধার ঐতিহ্যকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে জোর দিতে চায়, তাহলে সেই ঐতিহ্য সামরিক নামকরণে কেন বেশি প্রতিফলিত নয়?
আসল প্রশ্ন কোথায়?
পাকিস্তানের সামনে এখন একটি পরিচয়গত প্রশ্ন রয়েছে। দেশটি কি শুধু মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক ইতিহাসকে জাতীয় গর্বের কেন্দ্র করবে, নাকি বর্তমান ভূখণ্ডের বহুস্তরীয় প্রাচীন ঐতিহ্যকেও সমান গুরুত্ব দেবে? সিন্ধু সভ্যতা, গন্ধার, বৌদ্ধ ঐতিহ্য এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক ধারাকে গুরুত্ব দিলে পাকিস্তানের ইতিহাসচর্চা আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে সেই পথে হাঁটতে গেলে সামরিক প্রতীকের ভাষাও নতুন প্রশ্নের মুখে পড়বে।
শেষ কথা
সিন্ধু সভ্যতার উত্তরাধিকার নিয়ে পাকিস্তানের আগ্রহ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় এসেছে। ভারতের সঙ্গে সিন্ধু জল চুক্তি ঘিরে টানাপোড়েনের মধ্যেই ইসলামাবাদ প্রাচীন সিন্ধু ঐতিহ্যকে কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সামনে আনতে চাইছে।
কিন্তু একই সময়ে পাকিস্তানের সামরিক পরিচয়ে গজনভি, ঘৌরি, বাবর, আবদালি বা তৈমুরের মতো নাম রয়ে গেছে। এই নামগুলি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সামরিক অভিযান ও ক্ষমতা বদলের সঙ্গে যুক্ত। তাই পাকিস্তানের নতুন ঐতিহ্য-রাজনীতি কতটা সাংস্কৃতিক পুনর্মূল্যায়ন, আর কতটা কূটনৈতিক কৌশল—সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
