ব্যবসা-বাণিজ্য

হরমুজে নতুন উত্তেজনায় এক মাসের সর্বোচ্চে তেলের দাম, ভারতের বাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে?

নয়াদিল্লি: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ফের সংঘাত বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক মাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার সকালে সেপ্টেম্বরের ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫.৯২ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। দিনের শেষে কিছুটা কমে তা ৮৪.৭৩ ডলারে স্থির হয়। আগের দিন ব্রেন্টের দাম প্রায় ৯.৬ শতাংশ বেড়েছিল।

দাম বাড়ার মূল কারণ এখনই বিশ্ববাজারে তেলের তীব্র ঘাটতি নয়। ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল আরও কমে গেলে পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। ভবিষ্যতের সেই আশঙ্কাই বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলেছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী?

পারস্য উপসাগর থেকে আরব সাগরে যাওয়ার প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, কাতার, ইরাক ও ইরানের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছয়।

মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাবে, ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য হরমুজ দিয়ে পরিবহণ করা হয়েছে। এটি বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং সমুদ্রপথে হওয়া তেল বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যেরও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথের উপর নির্ভরশীল।

এই কারণে হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার খবরেই তেলের দর বেড়ে যায়। হামলার ঝুঁকি বাড়লে জাহাজের বিমা, নিরাপত্তা এবং পরিবহণ খরচও বাড়তে পারে। সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়।

জাহাজ চলাচল কতটা কমেছে?

জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার হিসাবে, ১০ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে হরমুজ দিয়ে মোট ৫৭টি জাহাজ যাতায়াত করেছে। আগের সপ্তাহের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৫২ শতাংশ কম। শুধু ১২ জুলাই প্রণালী পার হয়েছিল ১৪টি জাহাজ।

তবে জাহাজের সংখ্যা কমার অর্থ একই হারে তেল সরবরাহও কমেছে, এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনো যাবে না। প্রতিটি জাহাজের বহনক্ষমতা আলাদা। তা সত্ত্বেও যাতায়াতের এই পতন থেকে বোঝা যাচ্ছে, জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলি পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক রয়েছে।

নতুন করে কেন উত্তেজনা?

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে কয়েক দফা হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানি বন্দর থেকে আসা বা সেখানে যাওয়া জাহাজের উপর ফের অবরোধ আরোপের ঘোষণাও করেছে ওয়াশিংটন। ইরান পাল্টা হামলার দাবি করেছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবরও সামনে এসেছে। দুই পক্ষের দাবি স্বাধীনভাবে সব ক্ষেত্রে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যুক্তরাষ্ট্র পুরো হরমুজ প্রণালীতে সব দেশের জাহাজ চলাচল বন্ধ করার কথা বলেনি। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, অবরোধটি ইরানি বন্দরগামী, ইরান থেকে আসা অথবা ইরানি পণ্য বহনকারী জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য পথ খোলা রাখার দাবি করেছে ওয়াশিংটন।

পথ আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা থাকলেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকলে জাহাজ সংস্থাগুলি যাত্রা স্থগিত রাখতে পারে। বাজারের বড় উদ্বেগ সেখানেই।

হরমুজে ২০ শতাংশ ফি কি কার্যকর হচ্ছে?

সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ দিয়ে যাওয়া পণ্যের উপর ২০ শতাংশ নিরাপত্তা ফি বসানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন তিনি। উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প।

তাই হরমুজ দিয়ে যাতায়াতকারী সব জাহাজকে বর্তমানে ২০ শতাংশ ফি দিতে হচ্ছে—এমন দাবি সঠিক নয়। প্রস্তাবটি ঘোষণা করা হলেও পরে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর দিনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে তেলের দাম কিছুটা নেমেছিল।

ভারতের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?

হরমুজ দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেলের প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে ভারত রয়েছে। ২০২৪ সালে এই পথ দিয়ে এশিয়ায় যাওয়া তেলের বড় অংশের গন্তব্য ছিল ভারত, চিন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। ফলে দীর্ঘ সময় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে ভারতের তেল আমদানি খরচেও চাপ পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক তেলের দাম বাড়লে ডলারে ভারতের আমদানি ব্যয় বাড়ে। একই সময়ে ডলারের তুলনায় টাকা দুর্বল হলে খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব বিমান জ্বালানি, পণ্য পরিবহণ, রাসায়নিক, প্লাস্টিক এবং কিছু শিল্পের উৎপাদন খরচেও পড়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে ব্রেন্টের দাম এক বা দুই দিন বাড়লেই দেশে পেট্রল ও ডিজেলের দাম সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাবে, এমন নয়। দেশীয় জ্বালানির মূল্য নির্ভর করে ভারতীয় অপরিশোধিত তেলের গড় ক্রয়মূল্য, টাকার বিনিময় হার, কর এবং তেল বিপণন সংস্থার সিদ্ধান্তের উপর। ভারতের অপরিশোধিত তেলের গড় দাম আলাদাভাবে হিসাব ও প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের অধীনস্থ সংস্থা।

এখন কোন দিকে নজর থাকবে?

আগামী দিনে তেলের দাম মূলত তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করবে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের হামলা কমে কি না, হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয় কি না এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে কতটা অতিরিক্ত তেল পাঠাতে পারে।

দুই দেশের বিকল্প পাইপলাইন থাকলেও হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত সম্পূর্ণ তেল অন্য পথে পাঠানোর ক্ষমতা নেই। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাবে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির হাতে সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় ২৬ লক্ষ ব্যারেল অতিরিক্ত তেল বিকল্প পথে পাঠানোর সুযোগ থাকতে পারে। হরমুজ দিয়ে যাওয়া মোট তেলের তুলনায় তা অনেক কম।

এই মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য হল, নতুন সংঘাত ও জাহাজ চলাচল কমার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুড এক মাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। তবে হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং ভারতে পেট্রল বা ডিজেলের দাম বাড়ানোর কোনও নতুন ঘোষণা এখনও হয়নি।

Avatar photo

Bapan Biswas

বাপন বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। তিনি সাইটের সম্পাদকীয় পরিকল্পনা, তথ্য যাচাই এবং সংবাদ প্রকাশনার দায়িত্বে রয়েছেন। দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা ও বিনোদনের খবর সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে সহজ বাংলায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।