পুরীর রথযাত্রা কাল: বৃষ্টির আশঙ্কা, নিরাপত্তায় ১৩ হাজার পুলিশ; ট্রেন, পার্কিং ও জরুরি নম্বর একসঙ্গে
পুরী: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই পুরীতে অনুষ্ঠিত হবে শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা। শ্রীমন্দির থেকে পৃথক তিনটি রথে জগন্নাথদেব, বলভদ্র ও সুভদ্রা বড়দাণ্ড ধরে গুন্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগমের কথা মাথায় রেখে নিরাপত্তা, যান চলাচল, পার্কিং এবং রেল পরিষেবায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন।
ওড়িশা পর্যটন দফতরের সরকারি সূচি অনুযায়ী, ১৬ জুলাই মূল রথযাত্রার পর ২২ জুলাই সন্ধ্যা দর্শন, ২৪ জুলাই বাহুড়া যাত্রা, ২৫ জুলাই সুনাবেশ, ২৬ জুলাই অধরপানা এবং ২৭ জুলাই নীলাদ্রি বিজে অনুষ্ঠিত হবে। তবে প্রতিদিনের ধর্মীয় আচার কখন শুরু হবে, তা মন্দিরের নীতিকান্তি ও পরিস্থিতির উপর নির্ভর করতে পারে।
এক নজরে ২০২৬ সালের গুরুত্বপূর্ণ তারিখ
- রথযাত্রা: ১৬ জুলাই
- সন্ধ্যা দর্শন: ২২ জুলাই
- বাহুড়া যাত্রা: ২৪ জুলাই
- সুনাবেশ: ২৫ জুলাই
- অধরপানা: ২৬ জুলাই
- নীলাদ্রি বিজে: ২৭ জুলাই
মূল রথযাত্রার পাশাপাশি বাহুড়া যাত্রা ও সুনাবেশের দিনেও বড় জমায়েত হতে পারে। যে দিনই পুরী যান, ট্রেন, থাকার জায়গা ও ফেরার ব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তায় প্রায় ১৩ হাজার কর্মী
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে পুরীতে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। পুলিশের প্রস্তুতি বৈঠকের তথ্য অনুযায়ী, মোট প্রায় ১৩ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন থাকবেন। ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১৫টি কোম্পানি এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষীর বিশেষ দলও থাকবে। পুরী শহরে ৭০টি পুলিশ সহায়তা কেন্দ্র তৈরির কথাও জানানো হয়েছে।
ভিড় এবং যান চলাচল সামলাতে শহরকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দ্রুত সহায়তার জন্য বিশেষ দল রাখা হবে। বড়দাণ্ড, শ্রীমন্দির, তিনটি রথ, রেলস্টেশন এবং শহরের প্রবেশপথে বাড়তি নজরদারি থাকবে।
বড়দাণ্ডে ২৬টি নিরাপদ এলাকা
রথ চলার প্রায় তিন কিলোমিটার পথের পাশে ২৬টি নিরাপদ এলাকা চিহ্নিত করেছে পুলিশ। হঠাৎ ভিড় বেড়ে গেলে, কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে বা দ্রুত স্থান খালি করার প্রয়োজন হলে দর্শনার্থীদের এই জায়গাগুলিতে নিয়ে যাওয়া হবে।
নিরাপদ এলাকাগুলি মঠ, স্কুল, মণ্ডপ, হাসপাতাল, হোটেল ও খোলা জায়গার মধ্যে তৈরি হয়েছে। এগুলি সাধারণ বিশ্রামের জায়গা নয়। জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশ অনুযায়ী সেখানে যেতে হবে।
দর্শনার্থীদের জরুরি চলাচলের পথ, অ্যাম্বুল্যান্সের রাস্তা বা পুলিশের তৈরি ফাঁকা করিডরে দাঁড়িয়ে ছবি না তোলার অনুরোধ করা হয়েছে। এই পথগুলি বন্ধ হলে চিকিৎসা ও উদ্ধারকাজে দেরি হতে পারে।
গাড়ি নিয়ে গেলে কোথায় পার্কিং?
পুরী শহরে মোট ৩০টি পার্কিং এলাকা রাখা হয়েছে। সেখানে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও দু’চাকার যান মিলিয়ে প্রায় ২৩ হাজার ৮৪০টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
চার চাকার গাড়ির জন্য ২২টি জায়গায় প্রায় ৭,৭৩০টি গাড়ি রাখা যাবে। মাটিতোটা, পুরনো জগন্নাথ বল্লভ এবং ব্লু ফ্ল্যাগ–নীলাচল অশোক-সহ চারটি জায়গায় প্রায় ১৫ হাজার মোটরবাইক রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। মালতিপাটপুর, তালাবনিয়া, স্বামীনারায়ণ মন্দির-সংলগ্ন এলাকা ও সামাঙ্গায় প্রায় ৭৫০টি বাসের জায়গা রাখা হয়েছে।
কোন দিক থেকে গাড়ি পুরীতে ঢুকছে, তার ভিত্তিতে পার্কিংয়ের পথ বদলাতে পারে। তাই সামাজিক মাধ্যমে ঘুরতে থাকা পুরনো মানচিত্র নয়, পুরী পুলিশের সর্বশেষ যান নির্দেশিকা অনুসরণ করা উচিত।
যানজটের তথ্য জানাতে মহাসড়কের বৈদ্যুতিন পর্দা, সামাজিক মাধ্যম ও বার্তা পরিষেবা ব্যবহার করবে প্রশাসন। গাড়ির প্রবেশ ও বেরোনোর উপর নজর রাখতে তিনটি ড্রোন এবং ২৪৪টি সিসিটিভি ব্যবহারের কথা জানানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিশেষ ট্রেন
দক্ষিণ-পূর্ব রেলের সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ০৮৫৬৫ শালিমার–পুরী রথযাত্রা বিশেষ ট্রেন ১৫ ও ২৩ জুলাই সন্ধ্যা ৬টায় শালিমার থেকে ছাড়বে। পরদিন সকাল ৬টায় পুরী পৌঁছনোর কথা।
ফেরার পথে ০৮৫৬৬ পুরী–শালিমার বিশেষ ট্রেন ১৭ ও ২৫ জুলাই রাত ১২টা ৩০ মিনিটে পুরী থেকে ছেড়ে একই দিন দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে শালিমার পৌঁছবে। সাঁতরাগাছি, মেচেদা, খড়্গপুর, বেলদা, দাঁতন, জলেশ্বর, বস্তা, রূপসা, বালেশ্বর ও সোরো স্টেশনে ট্রেনটি থামবে।
রথযাত্রার পুরো পর্বে ভারতীয় রেল ৩০০টির বেশি বিশেষ ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা করেছে। পুরী স্টেশনে ৩০ হাজারের বেশি যাত্রীর জন্য অপেক্ষার জায়গা, বাড়তি টিকিট কাউন্টার, খাবার বিতরণ এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ট্রেনের সময় বা প্ল্যাটফর্ম শেষ মুহূর্তে বদলাতে পারে। রওনা হওয়ার আগে এনটিইএস, রেলের সরকারি অনুসন্ধান ব্যবস্থা অথবা সংশ্লিষ্ট স্টেশন থেকে বর্তমান অবস্থা মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
রথযাত্রার দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা
১৬ জুলাই পুরীতে আকাশ মেঘলা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বিকেলের দিকে কয়েক দফা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হতে পারে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ২৭ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন প্রায় ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকতে পারে। পূর্বাভাস সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, তাই রওনা হওয়ার আগে সর্বশেষ সতর্কতা দেখে নেওয়া উচিত।
বড় ছাতার বদলে হালকা বর্ষাতি সঙ্গে রাখা সুবিধাজনক। ভিড়ের মধ্যে খোলা ছাতা অন্য দর্শনার্থীর অসুবিধা বা আঘাতের কারণ হতে পারে। মোবাইল, পরিচয়পত্র ও টাকা জলরোধী ছোট ব্যাগে রাখা ভালো।
বজ্রপাত শুরু হলে খোলা সমুদ্রসৈকত, বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং অস্থায়ী লোহার কাঠামোর কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে।
থাকার জায়গা নিয়ে প্রতারণা থেকে সতর্কতা
রথযাত্রার সময় ভুয়ো হোটেল বুকিং সাইট, নকল দানের লিঙ্ক এবং সামাজিক মাধ্যমের মিথ্যা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতারণার আশঙ্কা থাকে। পুরী পুলিশ দর্শনার্থীদের শুধু যাচাই করা হোটেল বা সরকারি তালিকায় থাকা আবাসনের মাধ্যমে বুকিং করার পরামর্শ দিয়েছে। সন্দেহজনক লিঙ্কে টাকা পাঠানোর আগে হোটেলের ফোন নম্বর ও ঠিকানা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
পুরী জেলা প্রশাসনের সরকারি আবাসন তালিকায় পন্থনিবাস, নীলাদ্রি ভক্ত নিবাস, শ্রীগুন্ডিচা ভক্ত নিবাস ও নীলাচল যাত্রী নিবাসের যোগাযোগের তথ্য রয়েছে। তবে ঘর পাওয়া যাবে কি না, তা সরাসরি সংশ্লিষ্ট আবাসন থেকে নিশ্চিত করতে হবে।
শিশু ও প্রবীণদের নিয়ে গেলে কী করবেন?
শিশু ও প্রবীণদের হাতে বা পকেটে পরিবারের যোগাযোগের নম্বর লিখে রাখুন। দলের সদস্যরা আলাদা হয়ে গেলে কোথায় মিলিত হবেন, সেই জায়গা আগে ঠিক করে নিন।
সঙ্গে রাখুন:
- পরিচয়পত্র
- নিয়মিত ওষুধ
- পানীয় জল
- হালকা শুকনো খাবার
- বর্ষাতি
- চার্জ থাকা মোবাইল বা ছোট পাওয়ার ব্যাঙ্ক
রথের চাকা, দড়ি বা ব্যারিকেডের খুব কাছে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। ভিড়ের বিপরীত দিকে হাঁটা, হঠাৎ দৌড়ানো বা পুলিশের নির্দেশ অমান্য করা বিপজ্জনক হতে পারে।
জরুরি প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় নম্বর
- একক জরুরি পরিষেবা: ১১২
- অ্যাম্বুল্যান্স: ১০৮
- দমকল: ১০১
- শিশু সহায়তা: ১০৯৮
- পুরী পুলিশ পর্যটক সহায়তা: ৬৩৭০৯৬৭১০০
- পুরী পুলিশ হোয়াটসঅ্যাপ সহায়তা: ৮৭৬৩১৯৯৪০০
পুরী পুলিশের হোয়াটসঅ্যাপ সহায়তা নম্বরে যান চলাচল, নিরাপত্তা ও প্রতারণা-সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া যেতে পারে। জরুরি বিপদের ক্ষেত্রে সরাসরি ১১২ নম্বরে যোগাযোগ করাই উচিত।
রথ টানার সময় নিয়ে সতর্কতা
রথ টানার নির্দিষ্ট সময় নিয়ে বিভিন্ন অসরকারি ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমে আলাদা তথ্য ছড়িয়েছে। এই প্রতিবেদন তৈরির সময় মন্দির প্রশাসনের যাচাইযোগ্য পাতায় ১৬ জুলাইয়ের পূর্ণ ঘণ্টাভিত্তিক সূচি পাওয়া যায়নি।
তাই কোনও নির্দিষ্ট সময় নিশ্চিত ধরে যাত্রা না করাই ভালো। দর্শনার্থীদের মন্দির প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং ঘটনাস্থলের সরকারি ঘোষণার উপর নির্ভর করতে হবে।
এই মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য হল, ১৬ জুলাই পুরীতে মূল রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ ট্রেন, ৩০টি পার্কিং এলাকা, ২৬টি নিরাপদ স্থান এবং বহুস্তরীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় যাত্রার আগে আবহাওয়া, ট্রেনের বর্তমান অবস্থা এবং পুলিশের সর্বশেষ যান নির্দেশিকা মিলিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
তথ্যসূত্র: ওড়িশা পর্যটন দফতর, পুরী জেলা প্রশাসন, ভারতীয় রেল, ওড়িশা ও পুরী পুলিশের প্রকাশিত তথ্য এবং বর্তমান আবহাওয়ার পূর্বাভাস।
