রাজ্য

রাজারহাটের ভাড়াবাড়িতে বিস্ফোরণ, গ্রেফতার শামিম; উদ্ধার দুই বোমা

রাজারহাটের দক্ষিণ নারায়ণপুরে একটি ভাড়াবাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনায় মূল সন্দেহভাজন মহম্মদ শামিম ওরফে সেলিমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার সন্ধ্যায় কামারহাটি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় বলে পুলিশ-উদ্ধৃত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁকে নারায়ণপুর থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। এই ঘটনায় এই ঘটনায় এক নাবালক-সহ তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শুক্রবার রাত প্রায় ৮টা নাগাদ দক্ষিণ নারায়ণপুরের সুপারিবাগান এলাকার একটি বাড়ির নিচতলার ঘরে বিস্ফোরণ ঘটে। অভিঘাতে ঘরের দরজা ও দেওয়ালের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্তত একজন আহত হয়েছেন বলে পুলিশ-উদ্ধৃত সর্বশেষ তথ্যে জানানো হয়েছে। বিস্ফোরণের পর বাড়িটি ঘিরে তল্লাশি চালায় বিধাননগর পুলিশ, সিআইডি ও বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। তল্লাশির সময় ঘর থেকে আরও দুটি বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে সেগুলি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করেছে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। বিস্ফোরিত বোমার অংশ এবং বোমা তৈরিতে ব্যবহার করা হতে পারে—এমন কয়েক ধরনের সামগ্রীও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় এগুলির রাসায়নিক গঠন এবং উৎস জানার চেষ্টা হবে।

ব্যাগ রেখে বেরোনোর পরেই বিস্ফোরণ

তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে বাড়িটির নজরদারি ক্যামেরার দৃশ্য। সেখানে এক কিশোরকে একটি চটের ব্যাগ নিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখা যায়। ব্যাগটি রেখে সে বাইরে বেরিয়ে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিস্ফোরণ ঘটে। পুলিশের কাছে ওই নাবালকের দাবি, শামিম তাকে ব্যাগটি ঘরে রেখে আসতে বলেছিলেন। ব্যাগে খাবার রয়েছে বলেও জানানো হয়েছিল। নাবালকটির বক্তব্য সত্য কি না, সে নিজে ব্যাগের ভিতরের সামগ্রী সম্পর্কে জানত কি না এবং ঘটনার আগে শামিমের সঙ্গে তার কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল—সবই এখন যাচাই করছেন তদন্তকারীরা। নজরদারি ক্যামেরার সম্পূর্ণ দৃশ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সন্দেহভাজনদের ফোনের অবস্থান, কলের তথ্য এবং বিস্ফোরণের আগে-পরে তাঁদের চলাচলও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্যাগটি কোথা থেকে আনা হয়েছিল এবং বিস্ফোরকগুলি অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।

ঘর ভাড়া নেওয়ার সময় কী পরিচয় দিয়েছিলেন শামিম?

বাড়ির মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে ঘরটি ভাড়া নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন শামিম। সোমবার থেকে সেখানে তাঁর থাকার কথা ছিল। লিখিত চুক্তি ও ভাড়াটের পুলিশি যাচাই সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ঘর পরিষ্কার করার জন্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি বাড়ির মালিকের। শামিম যে পরিচয়পত্র ও ঠিকানা দিয়েছিলেন, তার সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকাশিত তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্যে দাবি করা হয়েছে, পরিচয়পত্রে থাকা ঠিকানায় গিয়ে শামিম নামে কাউকে পাওয়া যায়নি। পুলিশ এখন নথিটি আসল না জাল, সেটি পরীক্ষা করছে।

বাড়ির মালিক এবং ঘর ভাড়া দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত দালালকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁরা শামিমকে আগে থেকে চিনতেন কি না, ভাড়া নেওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনও ধারণা ছিল কি না এবং ঘরটির চাবি কখন তাঁর হাতে দেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ করা মানেই তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়।

শামিমের বিরুদ্ধে পুলিশের সন্দেহ কী?

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের সন্দেহ, বিস্ফোরক-ভর্তি ব্যাগটি শামিমের নির্দেশেই বাড়িতে আনা হয়েছিল। তাঁকে গ্রেফতার করার পর নাবালক ও অন্য জিজ্ঞাসাবাদাধীন ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর বয়ান মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘরে বোমা তৈরি হচ্ছিল, নাকি বাইরে থেকে তৈরি বোমা এনে রাখা হয়েছিল—এটি এখনও তদন্তের বিষয়। উদ্ধার সামগ্রী দেখে বোমা তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে তদন্ত শুরু হলেও ফরেনসিক রিপোর্টের আগে বাড়িটিকে নিশ্চিতভাবে ‘বোমা তৈরির কারখানা’ বলা ঠিক হবে না। একইভাবে কোনও নির্দিষ্ট জায়গায় হামলা বা বড় নাশকতার পরিকল্পনা ছিল—এমন প্রমাণও এখনও প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশের তদন্তে সেই ধরনের কোনও পরিকল্পনা, যোগাযোগ বা অপরাধচক্রের যোগ পাওয়া গেলে তার ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি ধারা যুক্ত হতে পারে।

NIA কি তদন্তভার নিয়েছে?

জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার একটি দল শনিবার বিস্ফোরণস্থল পরিদর্শন করেছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার আধিকারিকেরা ঘটনাস্থল ঘুরে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সিআইডি এবং রাজ্য পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলও তদন্তে যুক্ত রয়েছে। তবে NIA ঘটনাস্থলে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে সংস্থাটি মামলার পূর্ণ তদন্তভার নিয়ে নিয়েছে। এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত NIA-র সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে রাজারহাটের মামলা গ্রহণ বা নতুন মামলা নথিভুক্ত করার কোনও ঘোষণা পাওয়া যায়নি। মূল তদন্ত এখনও বিধাননগর পুলিশের অধীনেই চলছে বলে পাওয়া তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে। বিস্ফোরকের উৎস, পরিমাণ এবং সম্ভাব্য উদ্দেশ্য পরীক্ষা করার জন্য NIA প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে পারে। তদন্তে আন্তঃরাজ্য চক্র, সংগঠিত নাশকতা বা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত কোনও তথ্য পাওয়া গেলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তদন্ত এখন কোন দিকে এগোচ্ছে?

শামিমের গ্রেফতার এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তাঁর কাছ থেকে পুলিশ মূলত জানতে চাইছে—বোমাগুলি কোথা থেকে এসেছিল, কেন দক্ষিণ নারায়ণপুরের ওই বাড়িটি বেছে নেওয়া হয়েছিল এবং ব্যাগটি নাবালকের মাধ্যমে পাঠানোর কারণ কী। উদ্ধার সামগ্রীর ফরেনসিক রিপোর্ট, নজরদারি ক্যামেরার দৃশ্য, ফোনের তথ্য এবং অভিযুক্ত ও সাক্ষীদের বয়ান মিলিয়ে বিস্ফোরণের পূর্ণ ঘটনাক্রম তৈরি করা হবে। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে নিশ্চিত তথ্য হল—একটি আবাসিক বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেখান থেকে আরও দুটি বোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে এবং মূল সন্দেহভাজন শামিমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বোমাগুলি সেখানে কেন রাখা হয়েছিল এবং কোনও বড় পরিকল্পনা ছিল কি না, তার উত্তর এখনও তদন্তাধীন।

Avatar photo

Bapan Biswas

বাপন বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। তিনি সাইটের সম্পাদকীয় পরিকল্পনা, তথ্য যাচাই এবং সংবাদ প্রকাশনার দায়িত্বে রয়েছেন। দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা ও বিনোদনের খবর সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে সহজ বাংলায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।