খেলাধুলা

বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর বুয়েনস আইরেসে সংঘর্ষ, আটক অন্তত ১৫

বুয়েনস আইরেস: ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার হারের পর বুয়েনস আইরেসের ওবেলিস্ক এলাকায় পুলিশ ও ফুটবল সমর্থকদের একাংশের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়েছে। বোতল ও পাথর বৃষ্টি, পুলিশের লাঠিচার্জ এবং জলকামান ব্যবহারের জেরে রবিবার গভীর রাতে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় শহরের কেন্দ্রস্থল।

স্থানীয় সূত্রের খবর, এই অশান্তির ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন সাতজন পুলিশকর্মী। বেশ কয়েকজন সাধারণ সমর্থকও জখম হয়েছেন বলে জানা গেছে, তবে তাঁদের সঠিক সংখ্যা ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রশাসন এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।

নিউ জার্সিতে আয়োজিত মেগা ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের খেলায় ফেরান তোরেসের গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। টানা দ্বিতীয়বার ট্রফি জয়ের স্বপ্নভঙ্গ হলেও, মেসি ও তাঁর দলের লড়াকু ফুটবলকে কুর্নিশ জানাতে বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক ওবেলিস্ক স্মৃতিস্তম্ভের সামনে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।

যেভাবে উৎসবের আমেজ রূপ নিল সংঘর্ষে

ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর ওবেলিস্ক চত্বরের পরিবেশ প্রথমে বেশ শান্তিপূর্ণই ছিল। আর্জেন্টিনার পতাকা হাতে গান গাইছিলেন সমর্থকেরা, বাজছিল ঢাক আর আতশবাজির আলোয় রঙিন হয়ে উঠেছিল আকাশ। হারের হতাশা ভুলে ফাইনালে ওঠার জন্য প্রিয় দলকে ধন্যবাদ জানাতেই পরিবার ও শিশুদের নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন সাধারণ মানুষ।

তবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই জমায়েতের একটি অংশের উগ্র আচরণে পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। স্থানীয় সময় রাত পৌনে বারোটা নাগাদ একদল যুবক ওবেলিস্কের সুরক্ষায় থাকা নিরাপত্তাবেষ্টনী টপকানোর চেষ্টা করেন। পুলিশ বাধা দিলে তারা নিরাপত্তারক্ষীদের লক্ষ্য করে কাচের বোতল ও পাথর ছুড়তে শুরু করে। এরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ তাড়া করলে দু’পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।

সংঘর্ষ দ্রুত নাইন দে হুলিও এবং কোরিয়েন্তেস অ্যাভিনিউয়ের সংযোগস্থল ও আশপাশের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সাধারণ সমর্থক ও পরিবারগুলি দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যান।

জলকামান ও কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার

উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে বাধ্য হয়ে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে আসা ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের সাঁজোয়া গাড়ি থেকে জল ছুড়ে ভিড় সরানোর চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস এবং রাবার বুলেটও ছোঁড়ে বলে জানা গেছে।

এই হুড়োহুড়ি ও সংঘর্ষের মাঝে পড়ে বেশ কয়েকজন আহত হন। প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গেছে, ইটের আঘাতে অন্তত সাতজন পুলিশকর্মী জখম হয়েছেন। মুখমণ্ডলে আঘাত পাওয়া এক সমর্থককে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করতে দেখা যায়। এছাড়া এক মহিলাকেও জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দিতে হয়েছে। প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলা এই ধুন্ধুমার পরিস্থিতির পর পুলিশ নাইন দে হুলিও ধরে এগোতে থাকলে ওবেলিস্ক এলাকা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়।

আটকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ

অশান্তি ছড়ানোর দায়ে এ পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করে বিচারপ্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার মতো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, এই বিশৃঙ্খলার সঙ্গে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের কোনও সম্পর্ক ছিল না। হাজার হাজার মানুষের শান্তিপূর্ণ জমায়েতের সুযোগ নিয়ে স্রেফ একটি ছোট গোষ্ঠী এই তাণ্ডব চালিয়েছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে আগে থেকেই বন্ধ ছিল রাস্তা

ওবেলিস্কের আশপাশের রাস্তাগুলি যে কেবল সংঘর্ষের কারণেই বন্ধ হয়েছিল, তা নয়। বিশ্বকাপ ফাইনালের পর এখানে বিশাল জমায়েত হতে পারে, তা আগে থেকেই অনুমান করেছিল বুয়েনস আইরেস প্রশাসন।

সেই কারণে ওবেলিস্ক ও সংলগ্ন এলাকায় আগে থেকেই প্রায় এক হাজার পুলিশ কর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল এবং কোরিয়েন্তেস অ্যাভিনিউ ও দিয়াগোনাল নোর্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। তবে গভীর রাতে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর নাইন দে হুলিও সংলগ্ন এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

অন্যান্য শহরে শান্তিপূর্ণ জমায়েত

বুয়েনস আইরেসের এই অনভিপ্রেত ঘটনা বাদ দিলে আর্জেন্টিনার বাকি শহরগুলির চিত্র ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। লিওনেল মেসির জন্মশহর রোসারিওতে অবস্থিত জাতীয় পতাকা স্মৃতিস্তম্ভের সামনে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। হারের পরও প্রিয় দলকে ভালোবেসে স্মৃতিস্তম্ভটিকে আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকার রঙে আলোকিত করা হয়।

এছাড়া কর্দোবা, মার দেল প্লাতা ও বাহিয়া ব্লাঙ্কাতেও নীল-সাদা জার্সি আর পতাকা হাতে রাস্তায় নামেন ফুটবলপ্রেমীরা। কাপ না এলেও, রানার্স-আপ হওয়া মেসি বাহিনীকে বুকভরা অভিনন্দন জানিয়েছেন তাঁরা।

Avatar photo

Bapan Biswas

বাপন বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। তিনি সাইটের সম্পাদকীয় পরিকল্পনা, তথ্য যাচাই এবং সংবাদ প্রকাশনার দায়িত্বে রয়েছেন। দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা ও বিনোদনের খবর সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে সহজ বাংলায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।