‘বন্দে মাতরম’ অবমাননায় ৩ বছর পর্যন্ত জেলের প্রস্তাব! রাজ্যসভায় নতুন বিল ঘিরে বিতর্ক
নয়াদিল্লি: জাতীয় সঙ্গীতের মতোই এবার ‘বন্দে মাতরম’-কেও আইনি সুরক্ষা দিতে সংসদে নতুন বিল আনছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রস্তাবিত এই বিলে বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ায় বাধা দিলে বা গান চলাকালীন কোনও জমায়েতে বিঘ্ন ঘটালে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
সোমবার সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই রাজ্যসভায় বিলটি পেশ করার কথা ছিল। কিন্তু বিরোধীদের বিক্ষোভে সভার কাজ বারবার মুলতুবি হয়ে যাওয়ায় প্রথম দিন সেটি আর উত্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
কী রয়েছে প্রস্তাবিত এই নতুন বিলে?
বর্তমানে ১৯৭১ সালের ‘জাতীয় মর্যাদা অবমাননা প্রতিরোধ আইন’-এর ৩ নম্বর ধারায় জাতীয় সঙ্গীতকে (জনগণমন) সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ায় বাধা দিলে তিন বছরের জেল, জরিমানা অথবা উভয় শাস্তিরই বিধান রয়েছে এই আইনে।
কেন্দ্রীয় সরকার ‘দ্য প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-এর মাধ্যমে ওই আইনের ধারায় ‘জাতীয় গান’ (National Song) শব্দটি যুক্ত করতে চাইছে। অর্থাৎ, বিলটি পাশ হয়ে আইনে পরিণত হলে ‘বন্দে মাতরম’-এর অবমাননার ক্ষেত্রেও ঠিক একই কড়া শাস্তি প্রযোজ্য হবে। এমনকি, একবার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে অন্তত এক বছর জেলের যে বিধান বর্তমান আইনে রয়েছে, তা বন্দে মাতরমের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে।
নতুন করে কি মর্যাদা পাচ্ছে বন্দে মাতরম?
অনেকের ধারণা, এই বিলের মাধ্যমে হয়তো প্রথমবার ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় গানের স্বীকৃতি পাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদের শেষ বৈঠকে তৎকালীন সভাপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য ‘বন্দে মাতরম’-কে ‘জনগণমন’-এর সমান মর্যাদা দেওয়া হবে।
তবে সেই ঘোষণার পর ১৯৭১ সালের আইনে জাতীয় সঙ্গীত বা পতাকার অবমাননা নিয়ে শাস্তির কথা বলা হলেও, ‘বন্দে মাতরম’-এর নাম আলাদা করে উল্লেখ ছিল না। নতুন এই সংশোধনীর মাধ্যমে সেই আইনি ফাঁকটাই মেটাতে চাইছে কেন্দ্র।
বিজেপির নিশানায় নেহরু ও মুঘল আমল
এই প্রস্তাবিত বিলটিকে স্বাগত জানিয়ে ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের একটি প্রতিক্ষীত দাবি অবশেষে পূরণের পথে এগোচ্ছে।
তবে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। দলীয় পোস্টে অতীতের কংগ্রেস নেতৃত্ব ও ‘নেহরুবাদী রাজনীতি’-কে নিশানা করেছে বিজেপি। অভিযোগ করা হয়েছে, স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন এই গানটিকে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয়নি। এর জন্য তৎকালীন প্রশাসনের দ্বিধাকেই দায়ী করেছে গেরুয়া শিবির। এমনকি বাবর ও মুঘল শাসনের প্রসঙ্গ টেনে এনে বলা হয়েছে, ভারত এখন স্বাধীন রাষ্ট্র, তাই জাতীয় গানের মর্যাদা রক্ষার এই উদ্যোগকে সবার স্বাগত জানানো উচিত।
ইতিহাসের পাতায় নেতাজির অবস্থান
বিজেপির ওই পোস্টে দাবি করা হয়েছে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও ‘বন্দে মাতরম’ পরিবর্তন বা ভাগ করার বিরোধী ছিলেন। তবে ইতিহাসের পাতা ঘাটলে দেখা যায়, ১৯৩৭ সালে এই গানটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে সুভাষচন্দ্র বসুর পরামর্শেই জওহরলাল নেহরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত চেয়েছিলেন।
পরবর্তীতে কংগ্রেসের একটি বিশেষ উপসমিতি (যেখানে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন) জাতীয় অনুষ্ঠানে মূলত গানটির প্রথম দুই স্তবক ব্যবহারের সুপারিশ করে। কারণ, প্রথম দুই স্তবকে মাতৃভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা রয়েছে। পরবর্তী অংশে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর উল্লেখ থাকায় কিছু মহলে আপত্তি উঠেছিল। তাই নেতাজি গানটির প্রথম দুই স্তবক ব্যবহারের ঘোর বিরোধী ছিলেন— এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঐতিহাসিক দিক থেকে পুরোপুরি সঠিক নয়।
বিরোধিতার সুর সিপিএমের গলায়
ইতিমধ্যেই এই বিল প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি দিয়েছেন সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস। তাঁর স্পষ্ট যুক্তি, “ফৌজদারি শাস্তির ভয় দেখিয়ে দেশপ্রেম বাধ্যতামূলক করা যায় না।” প্রস্তাবিত এই আইন ব্যক্তির মতপ্রকাশ ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
সরকারের দাবি, গান চলাকালীন ইচ্ছাকৃত বিশৃঙ্খলা রোধ করাই এই বিলের প্রধান লক্ষ্য। তবে সমালোচনা আর ইচ্ছাকৃত বাধা দেওয়ার মধ্যে আইনি পার্থক্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে রাজ্যসভায় বিলটি পেশ হলে বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
