AI অ্যাপের ফাঁদে কোটি কোটি টাকা লোপাট! গ্রেপ্তার ১৮ বছরের সাইবার অপরাধী
সুরাট: দেখতে অবিকল ব্যাঙ্ক বা সরকারি পরিষেবার অ্যাপের মতো। কিন্তু ফোনে বসালেই গোপনে হাতিয়ে নেওয়া হত একবার ব্যবহারযোগ্য গোপন নম্বর, ব্যাঙ্কের তথ্য এবং ব্যক্তিগত বার্তা। এমন ১২১টি ক্ষতিকর অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ তৈরির অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের কানপুর থেকে ১৮ বছরের এক তরুণকে গ্রেফতার করেছে সুরাট শহর পুলিশের সাইবার অপরাধ দমন শাখা।
ধৃতের নাম রোহিত বীরেন্দ্রসিংহ শাক্য। পুলিশের দাবি, একাদশ শ্রেণির পরে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া ওই তরুণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন সরঞ্জাম কাজে লাগিয়ে ভুয়ো অ্যাপ তৈরি করতেন। মাসিক টাকার বিনিময়ে সেগুলি ঝাড়খণ্ডের জামতাড়া, হরিয়ানা ও রাজস্থানের বিভিন্ন সাইবার প্রতারণা চক্রকে সরবরাহ করা হত বলে অভিযোগ।
তদন্তকারীদের হিসাব অনুযায়ী, ওই অ্যাপগুলির সঙ্গে যুক্ত প্রতারণামূলক লেনদেনের মোট অঙ্ক প্রায় ৬৪ কোটি ৩৮ লক্ষ টাকা। তবে এই পুরো অঙ্কটি সরাসরি ধৃত তরুণের কাছে গিয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও আদালতে এখনও প্রমাণিত হয়নি।
পাঁচ লক্ষ টাকা খোয়ানোর অভিযোগ থেকে তদন্ত
পুলিশের দাবি, চলতি বছরের মে মাসে সুরাটের এক বাসিন্দার পাঁচ লক্ষ টাকা খোয়ানোর অভিযোগ ঘিরে তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগকারী জানান, ১৫ থেকে ১৮ মে-র মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর কাছে ‘PNB One.apk’ নামে একটি ফাইল পাঠানো হয়েছিল।
সেটিকে পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের আসল অ্যাপ ভেবে তিনি ফোনে বসিয়েছিলেন। তার পরেই তাঁর ফোনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রতারকদের নাগালে চলে যায় বলে অভিযোগ। প্রাইম কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কে থাকা তাঁর হিসাব থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের একটি হিসাবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি জাতীয় সাইবার অপরাধ সহায়তা নম্বর ১৯৩০-তে যোগাযোগ করেন। পরে সুরাট সাইবার অপরাধ দমন শাখায় মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু হয়।
কী ভাবে কাজ করত ভুয়ো অ্যাপ?
তদন্তকারীদের দাবি, প্রতারণার জন্য দু’ধরনের অ্যাপ তৈরি করা হয়েছিল। প্রথমটি পাঠানো হত সাধারণ মানুষের ফোনে। ব্যাঙ্কের পরিষেবা, আধার সংক্রান্ত কাজ, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা বা গাড়ির জরিমানা মেটানোর মতো পরিচিত পরিষেবার নাম ব্যবহার করা হত সেখানে।
দ্বিতীয়টি ছিল প্রতারকদের নিয়ন্ত্রণকারী অ্যাপ। কোনও ব্যক্তি প্রথম অ্যাপটি ফোনে বসিয়ে প্রয়োজনীয় অনুমতি দিলে তাঁর ফোনে আসা বার্তা, একবার ব্যবহারযোগ্য গোপন নম্বর এবং কিছু ব্যাঙ্কিং তথ্য নিয়ন্ত্রণকারী অ্যাপে দেখা যেত বলে পুলিশের দাবি। সেই তথ্য কাজে লাগিয়েই টাকা সরানোর চেষ্টা হত।
এসবিআই, পিএনবি, অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক, ইউকো ব্যাঙ্ক, আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক, ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক, আমেরিকান এক্সপ্রেস এবং বিগবাস্কেটের নাম ও পরিচিতি নকল করে অ্যাপ তৈরির অভিযোগ উঠেছে। আধার পরিষেবা, প্রধানমন্ত্রী কিসান যোজনা এবং গাড়ির ই-চালান মেটানোর নামেও ভুয়ো অ্যাপ তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।
২১ হাজারের বেশি ফোনে পৌঁছেছিল ক্ষতিকর অ্যাপ
ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষার পরে পুলিশ দাবি করেছে, অভিযুক্তের তৈরি ১২১টি ক্ষতিকর অ্যাপ দেশের ২১,৬৭২টি ফোনে বসানো হয়েছিল। এর মধ্যে ২,৯২৮টি ফোন সম্পূর্ণভাবে প্রতারকদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
এই ফোনগুলির তথ্য ব্যবহার করে ৫৪,০৯৪টি সন্দেহজনক ব্যাঙ্ক লেনদেন হয়েছে বলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান। লেনদেনের মোট অঙ্ক ৬৪ কোটি ৩৮ লক্ষ ৪৮ হাজার ৮৩৭ টাকা ৬০ পয়সা বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সবচেয়ে বেশি প্রতারণার যোগ পাওয়া গিয়েছে ভুয়ো গাড়ির ই-চালান অ্যাপের সঙ্গে। তার পরে রয়েছে এসবিআই এবং পিএনবি-র নামে তৈরি ভুয়ো অ্যাপ।
পুলিশের অভিযোগ, টেলিগ্রামের মাধ্যমে বিভিন্ন সাইবার অপরাধ চক্রের কাছে এসব অ্যাপ পৌঁছে দেওয়া হত। প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে দেওয়া অ্যাপ, নিয়মিত নতুন সংস্করণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হত।
কানপুরের একটি হোটেল থেকে রোহিতকে গ্রেফতারের সময় দুটি মোবাইল ফোন ও একটি ল্যাপটপ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সেগুলির বিস্তারিত পরীক্ষা চলছে। এই ব্যবস্থার সঙ্গে আর কারা যুক্ত এবং দেশের অন্য কোনও প্রতারণা চক্র একই সফটওয়্যার ব্যবহার করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
ভুয়ো APK ফাইল থেকে কী ভাবে নিরাপদ থাকবেন?
হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, এসএমএস বা ই-মেলের মাধ্যমে পাঠানো কোনও .apk ফাইল ফোনে বসানো উচিত নয়। ব্যাঙ্ক বা সরকারি পরিষেবার অ্যাপ কেবল স্বীকৃত অ্যাপ বিপণি অথবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরকারি ওয়েবসাইটে দেওয়া সংযোগ থেকে নামানো নিরাপদ।
কোনও সন্দেহজনক অ্যাপ বসানোর পরে ফোন অস্বাভাবিক আচরণ করলে দ্রুত ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করতে হবে। ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে হিসাব সুরক্ষিত করার পাশাপাশি ১৯৩০ নম্বরে ফোন অথবা জাতীয় সাইবার অপরাধ অভিযোগ পোর্টালে অভিযোগ জানানো প্রয়োজন।
