রাজ্য

শিলিগুড়ি করিডর ঘিরে নতুন প্রতিরক্ষা ভাবনা, কেন বলা হচ্ছে ‘এলিফ্যান্টস ট্রাঙ্ক’?

কলকাতা: উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডরকে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অন্যতম সংবেদনশীল ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে দেখা হয়েছে। সবচেয়ে সরু অংশে প্রায় ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার চওড়া এই ভূখণ্ড ভারতের মূল অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থলসংযোগ বজায় রাখে। তবে সাম্প্রতিক সামরিক পরিকাঠামো ও যোগাযোগ প্রকল্পের কারণে করিডরটিকে দেখার প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে বলে দাবি করছেন সেনার কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আধিকারিক।

এতদিন ‘চিকেনস নেক’ বা মুরগির গলার সঙ্গে তুলনা করে অঞ্চলটির সংকীর্ণতা ও সম্ভাব্য দুর্বলতা বোঝানো হত। এখন সামরিক মহলের একটি অংশ একে ‘এলিফ্যান্টস ট্রাঙ্ক’ বা হাতির শুঁড় হিসেবে বর্ণনা করছে। তাঁদের মতে, নতুন তুলনাটি শক্তি, নমনীয়তা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতাকে বোঝায়।

তবে ‘এলিফ্যান্টস ট্রাঙ্ক’ কোনও সরকারি নাম নয়। সেনার এক জ্যেষ্ঠ আধিকারিকের দেওয়া কৌশলগত ব্যাখ্যা হিসেবেই শব্দবন্ধটি সামনে এসেছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডর?

 

শিলিগুড়ি করিডরের মধ্য দিয়েই উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেল যোগাযোগ বজায় থাকে। জ্বালানি, খাদ্যসামগ্রী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও অঞ্চলটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

করিডরের উত্তরে নেপাল ও ভুটান এবং দক্ষিণে বাংলাদেশ। এর কাছেই সিকিম ও ভুটানের মধ্যবর্তী চিনের চুম্বি উপত্যকা। ফলে সাধারণ মানুষের যোগাযোগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও এই ভূখণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অতীতে আশঙ্কা ছিল, বড় ধরনের সংঘাতের সময় এই সরু এলাকায় যোগাযোগ ব্যাহত হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় সরবরাহে সমস্যা হতে পারে। সেই ঝুঁকি কমাতে গত কয়েক বছরে সীমান্ত সড়ক, রেলপথ, নজরদারি এবং সামরিক সহায়তা ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তিনটি সামরিক কেন্দ্র ঘিরে নতুন নিরাপত্তাবলয়

শিলিগুড়ি করিডরের বিভিন্ন দিকের নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে পশ্চিমবঙ্গের চোপড়া এবং বিহারের কিশনগঞ্জে সেনার অগ্রবর্তী ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি অসমের ধুবড়ি জেলার বামুনি এলাকায় ‘লাচিত বরফুকন মিলিটারি স্টেশন’ গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে ইস্টার্ন কমান্ডের সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর সি তিওয়ারি ধুবড়ির ওই সামরিক কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ফলে এটিকে ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ চালু সামরিক ঘাঁটি বলা ঠিক হবে না।

কিশনগঞ্জ করিডরের পশ্চিম দিকের যোগাযোগপথের কাছে অবস্থিত। চোপড়া রয়েছে বাংলাদেশ সীমান্ত এবং করিডরের সংবেদনশীল অংশের কাছাকাছি। ধুবড়ির কেন্দ্রটি অসম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকে সেনার রসদ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহায়তা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই কেন্দ্রগুলি সেনা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নজরদারি, তথ্য আদান-প্রদান এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বাহিনী পাঠানোর ক্ষমতা বাড়াতে পারে।

রেল ও সড়ক যোগাযোগেও বাড়তি গুরুত্ব

সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি বিকল্প ও সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরিও এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল জানিয়েছে, ডুমডাঙি থেকে বাগডোগরা পর্যন্ত প্রায় ৩৫.৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রস্তাবিত রেলপথের একটি বড় অংশ মাটির নীচ দিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পটি এখনও প্রস্তাব ও পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। তাই নির্মাণ শুরু হয়ে গিয়েছে—এমন দাবি করা যাবে না। বাস্তবায়িত হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে রেল যোগাযোগ সচল রাখার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এর সঙ্গে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রেলপথের ক্ষমতা বৃদ্ধি, সড়ক প্রশস্তকরণ এবং সীমান্ত এলাকার পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজও যুক্ত হয়েছে। মায়ানমারের মধ্য দিয়ে নির্মীয়মাণ কালাদান বহুমুখী পরিবহণ প্রকল্পকে উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি সম্ভাব্য বিকল্প যোগাযোগপথ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও প্রকল্পটির সব অংশ এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি।

চিন সীমান্তও রয়েছে পরিকল্পনার কেন্দ্রে

শিলিগুড়ি করিডরের উত্তর দিকে চিনের চুম্বি উপত্যকার অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। সিকিমের ডোকলাম এলাকার কাছাকাছি হওয়ায় অঞ্চলটি বিশেষভাবে সংবেদনশীল।

পশ্চিমবঙ্গের হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে ভারতীয় বায়ুসেনার রাফাল যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন রয়েছে। এর ফলে পূর্বাঞ্চলে প্রয়োজন হলে দ্রুত বিমান অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে শিলিগুড়ি করিডরের কাছে নির্দিষ্ট জায়গায় এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত সরকারি তথ্য নেই। নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত এমন দাবিকে তাই নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা সমীচীন নয়।

দুর্বলতা পুরোপুরি শেষ হয়েছে কি?

নতুন ঘাঁটি, উন্নত নজরদারি এবং সড়ক-রেল প্রকল্প করিডরের নিরাপত্তা বাড়ালেও এর ভৌগোলিক সংকীর্ণতা বদলায়নি। ফলে অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি, দুটিই রয়েছে।

‘এলিফ্যান্টস ট্রাঙ্ক’ তুলনাটি মূলত ভারতের পরিবর্তিত প্রতিরক্ষা অবস্থানের প্রতীক। এর মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে, শিলিগুড়ি করিডর এখন শুধু রক্ষা করার মতো একটি সরু পথ নয়; দ্রুত বাহিনী ও রসদ পাঠানোর উপযোগী শক্তিশালী কৌশলগত প্রবেশপথ হিসেবেও একে গড়ে তোলা হচ্ছে।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।