‘ভাড়া দিই নিয়মিত, তবুও উচ্ছেদ কেন?’ পুরসভার নোটিশে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা
কলকাতা: শহরের একাধিক ফ্লাইওভার ও সেতুর নিচে থাকা দোকান, স্টল এবং বাজার ঘিরে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কলকাতা পুরসভার নোটিশের পর ব্যবসায়ীদের একাংশের মধ্যে উচ্ছেদের আশঙ্কা বাড়ছে। তাঁদের দাবি, বহু জায়গায় বছরের পর বছর ধরে সরকারি বরাদ্দ, নিয়মিত ভাড়া, ট্রেড লাইসেন্স এবং বাজার রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মিটিয়ে ব্যবসা চালানো হচ্ছে। ফলে হঠাৎ দোকান খালি করার নির্দেশে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পুরসভা সূত্রের বক্তব্য, এই পদক্ষেপের মূল কারণ জননিরাপত্তা। ফ্লাইওভার ও সেতুর নিচের অংশ খালি না থাকলে স্তম্ভ, বিম এবং কাঠামোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও ফাটল, ক্ষয় বা কংক্রিট খসে পড়ার মতো সমস্যা থাকলে তা দ্রুত নজরে আনা জরুরি। সেই কারণেই রাজ্য সরকারের নির্দেশ মেনে শহরের বিভিন্ন ফ্লাইওভার ও সেতুর নিচের জায়গা obstruction-free করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক মহলের দাবি।
তবে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, নিরাপত্তার প্রয়োজন তাঁরা অস্বীকার করছেন না। কিন্তু যাঁরা সরকারি সংস্থার কাছ থেকে জায়গা পেয়েছেন বা দীর্ঘদিন ধরে নিয়ম মেনে ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী হবে—সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি।
সরকারি বরাদ্দের দাবি, তবু উচ্ছেদের ভয়
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের ছবি দেখা যাচ্ছে কসবার বিজন সেতুর নিচের KIT Market-এ। ব্যবসায়ীদের দাবি, ১৯৭৬ সালে তৎকালীন Kolkata Improvement Trust বা KIT তাঁদের দোকান বরাদ্দ করেছিল। পরে KIT, KMDA-র সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে তাঁরা KMDA-র কাছে নিয়মিত ভাড়া জমা দেন বলে দাবি করছেন।
এই বাজারে কয়েকশো দোকান রয়েছে। মুদিখানা, মাছ, সবজি-সহ নানা ধরনের দোকান চলে সেখানে। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, তাঁরা অবৈধ দখলদার নন। বহু দশক ধরে সরকারি ব্যবস্থার মধ্যেই ব্যবসা করছেন। তাই যদি কাঠামোগত নিরাপত্তার কারণে দোকান সরাতেই হয়, তবে পুনর্বাসন বা বিকল্প জায়গা নিয়ে আগে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানানো উচিত।
একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিয়ালদহ ফ্লাইওভারের নিচের শিশির মার্কেটেও। রিপোর্ট অনুযায়ী, সেখানে বহু permanent stall এবং temporary stall রয়েছে। বহু শ্রমিক, ভ্যানচালক, পোর্টার এবং দোকানের সঙ্গে যুক্ত কর্মীর জীবিকা এই বাজারগুলির উপর নির্ভরশীল। ফলে সাত দিনের নোটিশকে খুব কম সময় বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীদের একাংশ।
পুরসভার যুক্তি কী?
কলকাতা পুরসভার বক্তব্য, ফ্লাইওভার ও সেতুর নিচে দোকান, স্থায়ী নির্মাণ বা অস্থায়ী কাঠামো থাকলে নিয়মিত inspection বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক সময় স্তম্ভ বা deck-এর নিচের অংশ চোখে পড়ে না। ফলে কংক্রিট খসে পড়া, steel reinforcement ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা কাঠামোগত দুর্বলতার মতো সমস্যা দেরিতে ধরা পড়তে পারে।
২০১৮ সালে মাঝেরহাট সেতু ভেঙে পড়ার পর কলকাতার সেতু ও ফ্লাইওভারগুলির health audit নিয়ে প্রশাসনিক গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন সময় বিশেষজ্ঞ কমিটি সেতুগুলি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় মেরামতির সুপারিশ করেছে। সেই প্রেক্ষাপটেই ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা খালি রাখার বিষয়টি প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুরসভার নোটিশে বলা হয়েছে, অনুমোদনহীন স্থায়ী বা অস্থায়ী কাঠামো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরাতে হবে। না হলে KMC Act অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে ব্যবসায়ীদের একাংশের প্রশ্ন, যাঁদের সরকারি বরাদ্দ রয়েছে বলে দাবি, তাঁদের ক্ষেত্রে আলাদা নীতি কী হবে?
পুনর্বাসনের দাবি জোরালো
নোটিশ পাওয়ার পর ব্যবসায়ী ও হকার সংগঠনগুলির মধ্যে পুনর্বাসনের দাবি জোরালো হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, এক সপ্তাহের মধ্যে বহু বছরের ব্যবসা গুটিয়ে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। দোকান মানে শুধু একটি কাঠামো নয়, তার সঙ্গে যুক্ত থাকে মালপত্র, পরিবার, কর্মচারী, ক্রেতা এবং দৈনিক আয়।
অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, তাঁরা প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চান না। ফ্লাইওভার নিরাপত্তা জরুরি হলে তাঁরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। কিন্তু তাঁদের জন্য বিকল্প বাজার, অস্থায়ী স্থানান্তর বা ক্ষতিপূরণের রূপরেখা থাকা দরকার। পুনর্বাসন ছাড়া সরাসরি উচ্ছেদ হলে বহু পরিবার আর্থিক সঙ্কটে পড়তে পারে।
কিছু ব্যবসায়ী আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও ভাবছেন বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে। তাঁদের দাবি, নোটিশের আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা উচিত ছিল। বিশেষ করে যেখানে সরকারি বরাদ্দ বা নিয়মিত ভাড়া দেওয়ার দাবি রয়েছে, সেখানে সব দোকানকে একইভাবে দেখা ঠিক হবে না।
বৈধতা বনাম নিরাপত্তা—দুই দিকেই প্রশ্ন
এই ঘটনা শুধু উচ্ছেদ বা দখলদারি নিয়ে বিতর্ক নয়। এখানে একদিকে রয়েছে জননিরাপত্তা, অন্যদিকে বহু বছরের জীবিকা। ফ্লাইওভার ও সেতুর কাঠামো পরীক্ষা করা জরুরি—এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আপত্তি নেই। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, সরকারি সংস্থা যদি কোনও সময় দোকান বরাদ্দ করে থাকে, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ব্যবসায়ীদের কীভাবে সরানো হবে?
প্রশাসনের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হল, বৈধ বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী, হকার, অস্থায়ী দোকানদার এবং প্রকৃত encroachment—এই চারটি বিষয় আলাদা করে দেখা। সবাইকে একই নোটিশে এক কাতারে ফেললে বিভ্রান্তি বাড়তে পারে। আবার নিরাপত্তার প্রশ্নে দীর্ঘসূত্রতাও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শহরের বাজার ব্যবস্থার উপর প্রভাব
কলকাতার অনেক পুরনো বাজারই ফ্লাইওভার, সেতু বা রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে। এই বাজারগুলি শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, শহরের ক্ষুদ্র অর্থনীতির অংশ। স্থানীয় মানুষ কম দামে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারেন, আবার হাজার হাজার মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই বাজার থেকে রোজগার করেন।
তাই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু দোকানদারদের উপর পড়বে না, ক্রেতা, সরবরাহকারী, শ্রমিক এবং আশপাশের অর্থনীতির উপরও পড়তে পারে। সেই কারণে ব্যবসায়ীরা চাইছেন, হঠাৎ উচ্ছেদের বদলে ধাপে ধাপে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
শেষ কথা
কলকাতার ফ্লাইওভার ও সেতুর নিচের দোকান সরানোর নোটিশ শহরের নগর পরিকল্পনা, জননিরাপত্তা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ভবিষ্যৎ—এই তিনটি প্রশ্নকে একসঙ্গে সামনে এনেছে। প্রশাসনের দাবি, সেতু ও ফ্লাইওভারের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নিরাপত্তার জন্য এই পদক্ষেপ জরুরি। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, বহু দোকান সরকারি বরাদ্দে বা নিয়ম মেনে চলছে, তাই পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ তাঁদের জীবিকাকে বিপদের মুখে ফেলবে।
এখন নজর থাকবে কলকাতা পুরসভা ও রাজ্য সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। প্রশাসন কি বৈধ বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা নীতি ঘোষণা করবে, পুনর্বাসনের রূপরেখা দেবে, নাকি একসঙ্গে সমস্ত জায়গা খালি করার পথে এগোবে—এই উত্তরই নির্ধারণ করবে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
