ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’, হরমুজ হামলার পর তেহরানকে কড়া বার্তা ট্রাম্পের
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ বলে জানালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তেহরানের সঙ্গে আর আলোচনায় সময় নষ্ট করতে চান না। হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ এবং তার পর ইরানে মার্কিন হামলার পরই এই মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের বক্তব্য, ইরান যদি আবার হামলা চালায়, যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা জবাব দেবে। তবে তাঁর মন্তব্যে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, আলোচকরা কথা চালিয়ে যেতে চাইলে তা করতে পারেন, কিন্তু তাঁর নিজের মতে বিষয়টি “শেষ”।
আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প ইরানকে নিয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, তেহরানের সঙ্গে আর সময় নষ্ট করতে চান না। ইরানের নেতৃত্বকে নিয়েও তিনি তীব্র আক্রমণ করেন।
তবে তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশ অপমানজনক হওয়ায় তা সরাসরি উদ্ধৃত করা দায়িত্বশীল নয়। মূল বক্তব্য ছিল—ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে তাঁর আস্থা নেই এবং আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী নন।
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা রুখতেই যুক্তরাষ্ট্র চাপ বজায় রাখবে। তাঁর কথায়, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের পথে এগোতে না দেওয়া।
কেন যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ল?
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল। সেই সমঝোতার মাধ্যমে সংঘর্ষ সাময়িকভাবে কমানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার সঙ্গে ইরান-ঘনিষ্ঠ বাহিনীর যোগ থাকতে পারে। ইরানের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ নিয়ে পাল্টা বক্তব্যও সামনে এসেছে। তাই বিষয়টি এখনও দাবি ও পাল্টা দাবির স্তরেই রয়েছে।
ইরানে মার্কিন হামলা
হরমুজের ঘটনার পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমানো এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি পরিকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, ড্রোন সংক্রান্ত স্থাপনা এবং আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে দক্ষিণ ইরানের একাধিক এলাকায় বিস্ফোরণের খবর দেওয়া হয়েছে। কেশম দ্বীপ, সিরিক, বন্দর আব্বাস এবং খার্গ দ্বীপের মতো এলাকাতেও বিস্ফোরণের খবর সামনে এসেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া
ইরানি সংবাদমাধ্যমের দাবি, মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে। ফার্স সংবাদ সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, ওমান সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়েছে। তবে এই দাবির পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই এখনও সামনে আসেনি।
তেহরানের বক্তব্য, দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলছে, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পরিণতি ইরানকে ভোগ করতে হবে।
হরমুজ প্রণালী কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ। উপসাগরীয় দেশগুলির তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। তাই এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম, জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক বাজারে সরাসরি প্রভাব পড়ে।
AP-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রাম্পের মন্তব্য এবং নতুন সামরিক উত্তেজনার পর তেলের দামে বড় উত্থান দেখা যায়। বাজারে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সংঘাত আরও বাড়লে জ্বালানি সরবরাহে চাপ পড়তে পারে।
শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ কী?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তি চুক্তির আলোচনা আগে থেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। হরমুজে জাহাজে হামলার অভিযোগ, মার্কিন পাল্টা অভিযান এবং ট্রাম্পের কড়া মন্তব্য সেই অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।
তবে কূটনৈতিক দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ট্রাম্প আলোচকদের কথা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগের কথা বললেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাঁর মতে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এখন আর ফলপ্রসূ নয়।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ বলে ট্রাম্পের মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলার অভিযোগের পর মার্কিন হামলা এবং ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার দাবি নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
এখন নজর থাকবে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপ, তেল বাজারের প্রতিক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থানের দিকে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থির হতে পারে।
