তৃণমূলের তহবিল থেকে বিমান-হেলিকপ্টার কেনার অভিযোগ, ১৬০ কোটির লেনদেন খতিয়ে দেখছে ইডি
কলকাতা: তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ঘিরে ইডির তদন্তে এবার বিমান ও হেলিকপ্টার কেনার অভিযোগ সামনে এসেছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিমান পরিষেবা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা গিয়েছে। ওই টাকার একাংশ দিয়ে একটি ব্যবসায়িক বিমান এবং একটি হেলিকপ্টার কেনা হয়েছিল বলে ইডি দাবি করেছে। তবে এই অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন। আদালতে দোষ প্রমাণিত হয়নি।
ইডি ইতিমধ্যে তৃণমূলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা ফ্রিজ করেছে বলে জানা যাচ্ছে। এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে অর্থ তছরুপ প্রতিরোধ আইন বা পিএমএলএ-র অধীনে। পরে কলকাতা হাইকোর্ট দৈনন্দিন খরচ ও আইনি খরচের জন্য শর্তসাপেক্ষে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলার অনুমতি দিয়েছে। প্রতিটি লেনদেন আদালত-নিযুক্ত বিশেষ আধিকারিকের নজরদারিতে হবে।
ইডির তদন্তে কী দাবি?
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট থেকে কেয়ারওয়েল অ্যাভিয়েশন ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে। ওই সংস্থা কলকাতাভিত্তিক বিমান পরিষেবা ও ভাড়া সংক্রান্ত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যাচ্ছে।
ইডির দাবি, ওই অর্থের মধ্যে প্রায় ৮২.৯৬ কোটি টাকা আবার একটি নতুন সংশ্লিষ্ট সংস্থার অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। তদন্তকারীরা এই অর্থের পথ, ব্যবহার এবং শেষ পর্যন্ত কারা লাভবান হয়েছেন, তা খতিয়ে দেখছেন।
কোন বিমান ও হেলিকপ্টারের কথা উঠছে?
ইডির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ১১২ কোটি টাকা ব্যবহার করে একটি এমব্রেয়ার লেগ্যাসি ৬০০ ব্যবসায়িক বিমান এবং আগুস্তা ১০৯ সিরিজের একটি হেলিকপ্টার কেনা হয়। কয়েকটি প্রতিবেদনে হেলিকপ্টারের মডেল নিয়ে আলাদা উল্লেখ থাকায় এখানে “আগুস্তা ১০৯ সিরিজ” বলা হচ্ছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তদন্তে এসেছে। ইডির দাবি, ২০২৩ সালে কেম্যান আইল্যান্ডস-ভিত্তিক একটি সংস্থা থেকে প্রায় ১৭ লক্ষ মার্কিন ডলারের অসুরক্ষিত ঋণ নেওয়া হয়েছিল হেলিকপ্টার কেনার জন্য। এই বিদেশি ঋণের উৎস ও উদ্দেশ্যও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
কেন তদন্তের কেন্দ্রে ভাড়ার বিষয়?
ইডির দাবি, তৃণমূলের তহবিল থেকে অর্থ গিয়েছিল যে সংস্থায়, সেই সংস্থাই পরে বিমান ও হেলিকপ্টার তৃণমূলকে ভাড়ায় দিয়েছে। অর্থাৎ তদন্তকারীদের প্রশ্ন, যদি দলীয় তহবিলের অর্থে বিমান-হেলিকপ্টার কেনা হয়ে থাকে, তাহলে পরে সেই একই সম্পদ ব্যবহারের জন্য দলকে আবার ভাড়া দিতে হল কেন?
ইডির সন্দেহ, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়াল করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি এখনও তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ ও সন্দেহের স্তরে রয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ ছাড়া এটিকে প্রমাণিত ঘটনা বলা যাবে না।
তৃণমূলের অবস্থান কী?
তৃণমূল এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। দলের বক্তব্য, তাদের তহবিল, অনুদান এবং ব্যাঙ্ক লেনদেন নিয়ম মেনে নির্বাচন কমিশন ও আয়কর দফতরে জানানো হয়েছে। দল আরও দাবি করেছে, তদন্তকারী সংস্থাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অর্থাৎ এই মামলায় দুই পক্ষের অবস্থান আলাদা। ইডি বলছে, লেনদেনের পথ ও উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তৃণমূল বলছে, সব অর্থের হিসেব সরকারি দফতরে জমা দেওয়া আছে এবং তদন্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে।
আদালত কী বলেছে?
কলকাতা হাইকোর্ট তৃণমূলকে তিনটি অ্যাকাউন্ট থেকে শর্তসাপেক্ষে টাকা তোলার অনুমতি দিয়েছে। তবে টাকা তোলা যাবে শুধু দৈনন্দিন খরচ ও আইনি খরচের জন্য। প্রতিটি চেকের সঙ্গে দলের অনুমোদিত দুই স্বাক্ষরকারীর সই থাকবে। পাশাপাশি আদালত-নিযুক্ত বিশেষ আধিকারিকের পাল্টা সইও প্রয়োজন হবে।
অর্থাৎ আদালত একদিকে দলের দৈনন্দিন কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যাওয়া ঠেকিয়েছে। অন্যদিকে প্রতিটি খরচ নজরদারির মধ্যে রাখার ব্যবস্থাও করেছে।
এই মামলার গুরুত্ব কোথায়?
এই তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে সরাসরি একটি রাজনৈতিক দলের তহবিল, উচ্চমূল্যের বিমান-হেলিকপ্টার কেনা, ভাড়া চুক্তি এবং একাধিক সংস্থার মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের প্রশ্ন জড়িত। সাধারণ পাঠকের কাছে মূল প্রশ্ন হল—দলীয় তহবিল কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই ব্যবহারে নিয়ম মানা হয়েছে কি না, এবং অর্থের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা।
এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনই চূড়ান্ত নয়। তদন্ত, নথি, ব্যাঙ্ক লেনদেন, সংস্থার মালিকানা, ভাড়া চুক্তি এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে ছবিটা পরিষ্কার হবে।
এখন নজর কোথায়?
এখন নজর থাকবে ইডির পরবর্তী পদক্ষেপ, আদালতের শুনানি এবং তৃণমূলের আইনি পাল্টা পদক্ষেপের দিকে। তদন্ত চলায় নতুন নথি বা জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে তথ্য বদলাতে পারে।
তদন্তের পরবর্তী ধাপে ইডি ব্যাঙ্ক লেনদেন, বিমান-হেলিকপ্টার কেনার নথি এবং ভাড়া চুক্তির শর্ত খতিয়ে দেখতে পারে। আদালতের নজরদারিতে অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের অনুমতি মিললেও, এই মামলাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনই থামছে না।
