রাজ্য

তৃণমূলের সব পদ ছাড়লেন মদন মিত্র, যোগ দিলেন ঋতব্রত শিবিরে

কলকাতা: তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বড় মোড়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের সমস্ত সাংগঠনিক পদ থেকে ইস্তফা দিলেন কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র। বুধবার বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে বসে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।

তবে মদন তৃণমূলের প্রাথমিক সদস্যপদ কিংবা বিধায়ক পদ ছাড়েননি। তাঁর দাবি, তিনি তৃণমূলেই রয়েছেন। শুধু মমতা শিবির ছেড়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

বিধানসভায় সাংবাদিকদের সামনে মদন জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের কার্যকরী কমিটি, সাধারণ সম্পাদক এবং মুখ্য সচেতক-সহ তাঁর হাতে থাকা সমস্ত সাংগঠনিক পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কামারহাটি কেন্দ্র ধরে রাখার পরে দলে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। মমতা শিবিরের মুখ্য সচেতক হিসেবেও দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি। সেই পদও ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মদন।

তবে বিধায়ক পদ ছাড়ছেন না তিনি। মদনের বক্তব্য, “তৃণমূলে ছিলাম, তৃণমূলেই রইলাম। শুধু ওই ঘর থেকে এই ঘরে এলাম। ওই ঘরে হয়তো সুখের পালঙ্ক ছিল, এই ঘরে খাটিয়া আছে। আমি খাটিয়ার দিকটাই বেছে নিলাম।”

কেন ঋতব্রত শিবিরে গেলেন?

মদনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের পরে সংগঠনে বড় পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে দলকে নতুনভাবে পরিচালনা করার অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু সেই পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি বলে তাঁর দাবি।

মদন সরাসরি নাম না বললেও দলের বিপর্যয়ের জন্য “একজনকে” দায়ী করেছেন। তাঁর মন্তব্য, একটি মানুষের কারণে ২১৩ আসন পাওয়া একটি দলের বড় ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন মহলে এই বক্তব্যকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মদন নিজে ওই মন্তব্যে অভিষেকের নাম স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেননি।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরকেই বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে বলে জানিয়েছেন কামারহাটির বিধায়ক। সেই কারণেই তিনি ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

মমতা সম্পর্কে কী বললেন মদন?

শিবির বদল করলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ করেননি মদন। বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মমতার কাছ থেকে পাওয়া দায়িত্ব ও সমর্থনের কথা স্মরণ করেছেন।

একসময় কারাবন্দি থাকার সময় মমতা যেভাবে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সে কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সিদ্ধান্তের জন্য মমতার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলেও জানান।

যুব কংগ্রেসের সময় থেকেই মমতার সঙ্গে মদনের রাজনৈতিক সম্পর্ক। তৃণমূল প্রতিষ্ঠার পরেও তিনি তাঁর পাশে ছিলেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলের বড় পরাজয়ের পরেও প্রকাশ্যে মমতার পক্ষে কথা বলেছিলেন। বিদ্রোহী নেতাদের সমালোচনাও করেন। সেই কারণে তাঁর বর্তমান সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

মঙ্গলবার রাত থেকেই বাড়ছিল জল্পনা

মঙ্গলবার রাতে এন্টালির প্রাক্তন বিধায়ক স্বর্ণকমল সাহার বাড়িতে গিয়েছিলেন মদন মিত্র। স্বর্ণকমলের ছেলে সন্দীপন সাহা বর্তমানে ঋতব্রত শিবিরের অন্যতম নেতা। মদনের ওই সফরের পর থেকেই তাঁর শিবির বদলের জল্পনা শুরু হয়।

তবে ওই রাতে মদনের সঙ্গে সন্দীপন সাহার সরাসরি বৈঠক হয়েছিল কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে আলাদা তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তাই বৈঠক হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

বুধবার মদন নিজেই গাড়ি চালিয়ে বিধানসভায় পৌঁছন। সেখানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে গিয়ে তাঁর পাশে বসেই সমস্ত সাংগঠনিক পদ ছাড়ার কথা ঘোষণা করেন।

ইডির তলবের সঙ্গে সিদ্ধান্তের যোগ আছে?

পুরসভায় নিয়োগ সংক্রান্ত মামলার তদন্তে মদন মিত্রের স্ত্রী এবং দুই ছেলেকে তলব করেছে ইডি বলে তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে। পরিবারের কাছে নোটিশ পৌঁছনোর পরেই মদনের স্বর্ণকমল সাহার বাড়িতে যাওয়ায় দুই ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র নিয়ে রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়।

মদন অবশ্য শিবির বদলের কারণ হিসেবে ইডির পদক্ষেপের কথা বলেননি। ফলে তদন্তের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।

গত জুনে এই মামলায় মদনের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক ঠিকানায় তল্লাশি চালিয়েছিল ইডি। ভবানীপুর, জোকা ও দক্ষিণেশ্বর-সহ কয়েকটি জায়গায় অভিযান চলে। একটি ঠিকানা থেকে কিছু নথি সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট আবাসনের কর্মী জানিয়েছিলেন।

এর আগে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাও ওই মামলায় তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছিল। তবে তল্লাশি বা তলবের অর্থ অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। মদন মিত্র বা তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত নয়।

তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্ব আরও গভীর

এর আগে ফিরহাদ হাকিম, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, অরূপ বিশ্বাস এবং চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের মতো একাধিক প্রবীণ নেতা ঋতব্রত শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এবার মদনের যোগদানে মমতা শিবিরের উপর সাংগঠনিক চাপ আরও বাড়ল।

এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, মদনের ইস্তফা দলীয় নিয়মে কীভাবে গ্রহণ করা হবে এবং বিধানসভায় তাঁর ভূমিকা কী হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অংশের পক্ষ থেকেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনও বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।