‘কোনও স্ত্রী ধর্ম বদলাননি’, তৃতীয় বিয়ে নিয়ে বিতর্কে জবাব আমির খানের
মুম্বই: গৌরী স্প্র্যাটকে বিয়ের পর ধর্মান্তরণ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিলেন আমির খান। অভিনেতার দাবি, গৌরী বা তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী রিনা দত্ত ও কিরণ রাও, কেউই বিয়ের জন্য নিজের ধর্ম পরিবর্তন করেননি। প্রতিটি বিয়েই ধর্মীয় রীতির পরিবর্তে নাগরিক আইনের আওতায় হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
৫ জুলাই মুম্বইয়ের পালী হিলের বাসভবনে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বন্ধুদের উপস্থিতিতে গৌরীকে বিয়ে করেন আমির। বিশেষ বিবাহ আইনের আওতায় তাঁদের বিয়ে নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে আমির জানান, তাঁর কোনও স্ত্রীই বিয়ের আগে বা পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি। সবক’টি সম্পর্কেই দু’জনের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় বজায় ছিল।
আমিরের কথায়, “গৌরী, কিরণ বা রিনা, কেউই ধর্ম পরিবর্তন করেননি। আমাদের বিয়ে নাগরিক আইনের মাধ্যমে হয়েছে। গৌরী হিন্দুও নন, তিনি খ্রিস্টান। তবে তিনি নিয়মিত ধর্মীয় আচার পালন করেন না।”
তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ‘লভ জিহাদ’-এর সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টাকে অযৌক্তিক বলেও মন্তব্য করেন অভিনেতা। এই প্রসঙ্গে তাঁর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, “সময়ের সঙ্গে জীবন যেন আরও হাস্যকর হয়ে উঠছে।”
‘লভ জিহাদ’ শব্দবন্ধটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কে ব্যবহৃত হয়। আমির বা গৌরীর সম্পর্কে ধর্মান্তরণের কোনও প্রমাণ সামনে আসেনি। বরং অভিনেতা নিজেই সেই দাবি অস্বীকার করেছেন।
বিশেষ বিবাহ আইনে ধর্ম পরিবর্তন কি প্রয়োজন?
আমির ও গৌরীর বিয়ে বিশেষ বিবাহ আইন, ১৯৫৪-এর আওতায় নথিভুক্ত হয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এই আইনে ভিন্ন ধর্মের দুই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখেই বিয়ে করতে পারেন। বিয়ের জন্য কাউকে অন্য ধর্ম গ্রহণ করতে হয় না।
আমির তাঁদের বিয়েকে ‘সিভিল ম্যারেজ’ বা নাগরিক বিবাহ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ, বিয়েটির আইনি ভিত্তি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় রীতি নয়।
তবে তাঁদের বিবাহের নথি প্রকাশ্যে আনা হয়নি। ফলে বিয়ের আইনি প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে, তা মূলত আমিরের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনভিত্তিক।
পরিবারের উদাহরণও দিলেন অভিনেতা
আমিরের দাবি, তাঁদের পরিবারে আন্তঃধর্মীয় বিয়ে নতুন নয়। তাঁর দুই বোন হিন্দু পরিবারে বিয়ে করেছেন। মেয়ে ইরা খান বিয়ে করেছেন নূপুর শিখরেকে। আমিরের খুড়তুতো ভাই তথা চলচ্চিত্র নির্মাতা মনসুর খানের স্ত্রীও খ্রিস্টান।
এই উদাহরণ তুলে ধরে অভিনেতা বোঝাতে চেয়েছেন, তাঁর পরিবারে ধর্মের ভিত্তিতে সম্পর্ক বিচার করা হয় না। পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত পছন্দকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আমিরের মতে, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু কোনও তথ্য ছাড়াই ধর্মান্তরণের অভিযোগ করা ঠিক নয়।
ধর্মীয় নেতার আপত্তি কোথায়?
উত্তরপ্রদেশের মুসলিম পার্সোনাল দারুল ইফতার সঙ্গে যুক্ত শাহী চিফ মুফতি মওলানা চৌধুরী ইব্রাহিম হুসেন আমিরের বিয়ে নিয়ে ধর্মীয় আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একজন মুসলিম পুরুষের অমুসলিম নারীকে বিয়ে করা শরিয়তসম্মত নয়। এই অবস্থানের ভিত্তিতেই তিনি একটি ফতোয়া দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
এটি সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় নেতার ব্যাখ্যা ও মতামত। ভারতের আইনে ফতোয়া কোনও আদালতের নির্দেশ নয় এবং তা কারও উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
২০১৪ সালের একটি রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছিল, ফতোয়ার কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চাইলে তা গ্রহণ, প্রত্যাখ্যান অথবা উপেক্ষা করতে পারেন। ফলে এই ফতোয়া আমির ও গৌরীর নথিভুক্ত বিয়ের বৈধতা নিজে থেকে বাতিল করতে পারে না।
নিতেশ রাণে কী বলেছেন?
মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নিতেশ রাণে আমিরের তৃতীয় বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, আমিরকে ‘লভ জিহাদ’-এর প্রতিনিধি হিসেবে দেখা উচিত কি না, তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। অভিনেতার ছবি দেখার আগে দর্শকদের বিষয়টি ভেবে দেখার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
এটি নিতেশ রাণের রাজনৈতিক মন্তব্য। আমিরের বিয়েতে জোরপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে ধর্মান্তরণের কোনও অভিযোগ গৌরী করেননি। এমন কোনও প্রমাণও প্রকাশ্যে আসেনি। তাই রাজনৈতিক বক্তব্যকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
আমিরের আগের দুই বিয়ে
১৯৮৬ সালে রিনা দত্তকে বিয়ে করেছিলেন আমির। তাঁদের দুই সন্তান জুনেইদ ও ইরা। ২০০২ সালে আমির ও রিনার বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
২০০৫ সালে পরিচালক কিরণ রাওকে বিয়ে করেন অভিনেতা। ২০২১ সালে তাঁরা বিচ্ছেদের কথা ঘোষণা করেন। বিচ্ছেদের পরেও ছেলে আজাদের দায়িত্ব যৌথভাবে পালন করছেন দু’জন। চলচ্চিত্রের কাজেও তাঁদের একসঙ্গে দেখা গিয়েছে।
গৌরীর সঙ্গে সম্পর্কের কথা আমির প্রথম প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন ২০২৫ সালে নিজের জন্মদিনে। ২০২৬ সালের ৫ জুলাই ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁরা বিয়ে করেন। নতুন বিয়ের পরে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক তৈরি হলেও আমিরের বক্তব্য স্পষ্ট—তাঁর কোনও সম্পর্কেই ধর্মান্তরণ শর্ত ছিল না।
