ইতিহাস গড়ল বিক্রম-১, ভারতের প্রথম বেসরকারি রকেটের সফল কক্ষপথ অভিযান
ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে প্রথম বার কোনও বেসরকারি সংস্থার তৈরি রকেট সফলভাবে পৃথিবীর কক্ষপথে পেলোড পৌঁছে দিল। হায়দরাবাদের Skyroot Aerospace-এর তৈরি Vikram-1 শনিবার শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপিত হয়। পরীক্ষামূলক অভিযানে রকেটটি প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার উচ্চতার নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে সংস্থা।
‘Mission Aagaman’ নামের এই অভিযানে ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন সংস্থার গ্রাহক পেলোড এবং মহাকাশে প্রযুক্তি পরীক্ষার সরঞ্জাম বহন করেছে Vikram-1। কক্ষপথে পৌঁছনোর পর পেলোডগুলি ছাড়ার প্রক্রিয়াও সফল হয়েছে বলে Skyroot-এর দাবি। সংস্থাটি অবশ্য স্পষ্ট করেছে, এটি বাণিজ্যিক পরিষেবা নয়—রকেটটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষামূলক কক্ষপথ অভিযান। নিয়মিত উৎক্ষেপণ শুরুর আগে আরও কয়েকটি পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের ৩৫ মিনিট পরে উৎক্ষেপণ
Vikram-1-এর উৎক্ষেপণ হওয়ার কথা ছিল শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায়। শেষ মুহূর্তে স্বয়ংক্রিয় উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে থামানো হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষ করে দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়।
উড্ডয়নের পর রকেটটির তিনটি কঠিন জ্বালানিচালিত ধাপ একে একে কাজ শেষ করে আলাদা হয়ে যায়। এর পর উপরের অংশে থাকা তরল জ্বালানিচালিত ব্যবস্থা রকেটকে নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছে দেয়। অভিযানের পরে Skyroot জানায়, রকেটের চালন ব্যবস্থা, দিকনির্দেশ, যোগাযোগ এবং উড়ান নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশামতো কাজ করেছে।
কেন Vikram-1-কে ভারতের প্রথম বেসরকারি রকেট বলা ঠিক নয়?
Skyroot-এর তৈরি Vikram-S ২০২২ সালের নভেম্বরে শ্রীহরিকোটা থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপিত হয়েছিল। সেটিই ছিল ভারতের কোনও বেসরকারি সংস্থার তৈরি প্রথম রকেট, যা মহাকাশে পৌঁছেছিল। তবে Vikram-S-এর যাত্রা ছিল উপ-কক্ষপথীয়—রকেটটি পৃথিবীর চারদিকে ঘোরার মতো স্থায়ী কক্ষপথে কোনও উপগ্রহ বসায়নি।
Vikram-1-এর সাফল্য এখানেই আলাদা। এটি পৃথিবীর নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছে সঙ্গে থাকা পেলোডগুলি সেখানে স্থাপন করেছে। তাই খবরটির নির্ভুল পরিচয় হবে—ভারতের প্রথম বেসরকারিভাবে তৈরি কক্ষপথগামী রকেটের সফল অভিযান।
কী ধরনের রকেট Vikram-1?
প্রায় ২২ মিটার উঁচু Vikram-1 মূলত ছোট উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানোর জন্য তৈরি। এর নীচের তিনটি ধাপে কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছে। উপরের অংশে রয়েছে তরল জ্বালানিচালিত ‘অরবিটাল অ্যাডজাস্টমেন্ট মডিউল’। এই অংশের ইঞ্জিন মহাকাশে প্রয়োজন অনুযায়ী চালু, বন্ধ এবং ফের চালু করা যায়। ফলে একই অভিযানে একাধিক পেলোডকে কিছুটা ভিন্ন অবস্থানে ছাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
রকেটটির কাঠামোর বড় অংশ কার্বন-কম্পোজিট উপাদানে তৈরি। সাধারণ ধাতুর তুলনায় এই উপাদান হালকা হলেও প্রয়োজনীয় শক্তি ধরে রাখতে পারে। উপরের ধাপের তরল ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
Skyroot-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, Vikram-1 নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে সর্বোচ্চ ৩৫০ কিলোগ্রাম এবং সূর্য-সমলয় কক্ষপথে সর্বোচ্চ ২৬০ কিলোগ্রাম পেলোড বহনের জন্য তৈরি। তবে শনিবারের পরীক্ষামূলক অভিযানে মোট কত ওজনের পেলোড পাঠানো হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
এই সাফল্য ভারতের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এত দিন ভারত থেকে কক্ষপথে রকেট পাঠানোর দায়িত্ব প্রধানত সরকারি মহাকাশ সংস্থার হাতেই ছিল। Vikram-1 দেখাল, দেশের একটি বেসরকারি সংস্থাও পূর্ণাঙ্গ রকেট তৈরি করে সেটিকে কক্ষপথে পৌঁছে দিতে পারছে। তবে অভিযানটি সরকারি পরিকাঠামোর বাইরে হয়নি। রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে ISRO-এর শ্রীহরিকোটা কেন্দ্র থেকে।
ছোট উপগ্রহের চাহিদা বাড়ায় বিশ্বের বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ বাজারেও পরিবর্তন এসেছে। কৃষিজমি পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়ার তথ্য, মানচিত্র তৈরি, যোগাযোগ এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মতো কাজে ছোট উপগ্রহ ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ধরনের উপগ্রহের মালিকদের অনেক সময় বড় রকেটের পরবর্তী অভিযানের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
Skyroot-এর লক্ষ্য হল ছোট উপগ্রহের জন্য আলাদা অথবা অন্য পেলোডের সঙ্গে ভাগ করে উৎক্ষেপণের ব্যবস্থা করা। সংস্থার দাবি, গ্রাহকের প্রয়োজন অনুযায়ী কক্ষপথ বেছে নেওয়া এবং তুলনামূলক দ্রুত উৎক্ষেপণের সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এই সুবিধার প্রকৃত খরচ, নিয়মিত অভিযানের ব্যবধান এবং দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা জানতে আরও কয়েকটি সফল উড়ানের প্রয়োজন হবে।
সাফল্যের পরও যে পরীক্ষা বাকি
প্রথম অভিযানে কক্ষপথে পৌঁছনো বড় সাফল্য হলেও Vikram-1 এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। উড়ানের প্রতিটি ধাপ থেকে পাওয়া তথ্য এখন বিশ্লেষণ করবেন Skyroot-এর প্রকৌশলীরা। কোনও ব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন কি না, পরবর্তী পরীক্ষায় সেটিও যাচাই করা হবে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরুর আগে Vikram-1-এর আরও কয়েকটি পরীক্ষামূলক অভিযান হবে। ফলে শনিবারের সাফল্য বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণের দরজা খুললেও, রকেটটি এখনই নিয়মিত পরিষেবার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত—এমন দাবি করা যাবে না।
Vikram-1-এর প্রথম কক্ষপথ অভিযান তাই শুধু একটি রকেট উৎক্ষেপণের খবর নয়। এটি ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রথম বড় পরীক্ষা। এই সাফল্য কতটা স্থায়ী ব্যবসায়িক সুযোগে বদলে যায়, তা নির্ভর করবে পরবর্তী পরীক্ষাগুলির ফল, উৎক্ষেপণের খরচ এবং গ্রাহকদের জন্য নির্ভরযোগ্য পরিষেবা দেওয়ার ক্ষমতার উপর।
