FIFA World Cup 2026 Final: ফেরান তোরেসের ম্যাজিক! দশ জনের আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন
লাল কার্ড, অতিরিক্ত সময় এবং শেষ মুহূর্তের স্নায়ুচাপে ভরা ফাইনাল দেখল ফুটবল বিশ্ব। শেষ পর্যন্ত লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা জিতল স্পেন। নিউ জার্সির নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনও দল গোল করতে পারেনি। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেসের বাঁ-পায়ের শট ম্যাচের ব্যবধান গড়ে দেয়। ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতল ‘লা রোহা’। নির্ধারিত সময়ের যোগ করা অংশে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টিনার এনজো ফের্নান্দেস। ফলে অতিরিক্ত সময়ের পুরোটা দশ জন নিয়ে খেলতে হয় গতবারের চ্যাম্পিয়নদের। এমিলিয়ানো মার্তিনেসের একের পর এক সেভে আর্জেন্টিনা দীর্ঘ সময় ম্যাচে টিকে থাকলেও শেষ পর্যন্ত স্পেনের চাপ সামলাতে পারেনি।
মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে স্পেন
ফাইনালের শুরু থেকেই বলের দখল নিজেদের হাতে রাখে স্পেন। রদ্রি ও ফাবিয়ান রুইসের নিয়ন্ত্রিত পাসে মাঝমাঠে এগিয়ে ছিল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। দুই প্রান্ত থেকে লামিন ইয়ামাল ও অ্যালেক্স বায়েনাও নিয়মিত আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ তৈরি করেন। আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই সতর্কভাবে খেলছিল। রক্ষণে জায়গা কমিয়ে স্পেনের আক্রমণ আটকানোর পাশাপাশি পাল্টা আক্রমণের সুযোগ খুঁজছিল তারা। লিওনেল মেসিকে মাঝমাঠের অনেকটা নিচে নেমে বল নিতে দেখা যায়। তবে স্পেনের চাপের কারণে আক্রমণভাগের সতীর্থদের সঙ্গে নিয়মিত যোগসূত্র তৈরি করতে পারেননি তিনি। প্রথমার্ধে বলের দখল বেশি থাকলেও গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি স্পেন। আর্জেন্টিনার রক্ষণ এবং গোলপোস্টের নিচে এমিলিয়ানো মার্তিনেস স্প্যানিশ আক্রমণকারীদের আটকে রাখেন। অন্যদিকে স্পেনের গোল লক্ষ্য করে প্রথম ৯০ মিনিটে কোনও শটই নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
মার্তিনেসের সেভে ম্যাচে টিকে ছিল আর্জেন্টিনা
দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের গতি আরও বাড়ায় স্পেন। ৬২ মিনিটে মিকেল ওইয়ারসাবালের জায়গায় ফেরান তোরেসকে মাঠে নামান দে লা ফুয়েন্তে। পরে নিকো উইলিয়ামস ও পেদ্রিকেও ব্যবহার করেন তিনি। স্পেন একের পর এক সুযোগ তৈরি করলেও মার্তিনেসের বাধা পেরোতে পারছিল না। পুরো ম্যাচে ১২টি সেভ করেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে কোনও গোলরক্ষকের এটি সর্বাধিক সেভের রেকর্ড। শুধু গোলরক্ষকের পারদর্শিতাই আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ সময় গোলশূন্য রাখতে সাহায্য করে। স্পেন প্রথম ২০টি শট নেয়। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে ম্যাচে প্রথম শট নিতে পারে আর্জেন্টিনা।
লাল কার্ডে বদলে গেল ম্যাচের পরিস্থিতি
নির্ধারিত সময়ের যোগ করা অংশে বড় ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা। স্পেনের পাউ কুবারসিকে ফাউল করার পরে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন এনজো ফের্নান্দেস। এর ফলে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। অতিরিক্ত সময়ে দশ জন নিয়ে খেলতে নেমে রক্ষণ আরও শক্ত করে আর্জেন্টিনা। আক্রমণভাগের হুলিয়ান আলভারেসকে তুলে ডিফেন্ডার মার্কোস সেনেসিকে মাঠে নামান কোচ লিওনেল স্কালোনি। তাঁর লক্ষ্য ছিল স্পেনকে আটকে ম্যাচটি টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়া। অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে নিকো উইলিয়ামস বল জালে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু গোলের আগে মিকেল মেরিনোর ফাউল ধরা পড়ায় সেটি বাতিল করে দেন রেফারি। সেই যাত্রায় বাঁচলেও আর্জেন্টিনার উপর স্পেনের চাপ কমেনি।
১০৬ মিনিটে তোরেসের জয়সূচক গোল
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আসে ম্যাচের একমাত্র গোল। বক্সের মধ্যে আসা লম্বা বল মাথা দিয়ে ফেরান তোরেসের দিকে বাড়িয়ে দেন নিকো উইলিয়ামস। বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাঁ-পায়ের জোরালো শটে মার্তিনেসকে পরাস্ত করেন তোরেস। ম্যাচের ১০৬ মিনিটে তাঁর শট জালে জড়াতেই এগিয়ে যায় স্পেন। এটি ছিল ম্যাচে স্পেনের ২০তম শট এবং চলতি বিশ্বকাপে তোরেসের প্রথম গোল।
গোল হজম করার পরে আর্জেন্টিনা সামনে ওঠার চেষ্টা করলেও স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারেনি। ম্যাচে আর্জেন্টিনার মোট শট ছিল দুটি। কোনও শটই লক্ষ্যে পৌঁছায়নি। বিপরীতে স্পেন নেয় ২০টি শট, যার মধ্যে ১২টি ছিল লক্ষ্যে। কর্নারের হিসাবেও স্পেনের আধিপত্য স্পষ্ট ছিল। ম্যাচের প্রথম ১০টি কর্নারের মধ্যে নয়টিই পেয়েছিল স্পেন। ফলে স্কোরলাইন ১-০ হলেও ম্যাচের অধিকাংশ সময় দখল ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
পরিসংখ্যানেও স্পেনের দাপট
- ম্যাচের ফল: স্পেন ১-০ আর্জেন্টিনা
- গোল: ফেরান তোরেস—১০৬ মিনিট
- স্পেনের মোট শট: ২০
- লক্ষ্যে শট: ১২
- আর্জেন্টিনার মোট শট: ২
- আর্জেন্টিনার লক্ষ্যে শট: ০
- এমিলিয়ানো মার্তিনেসের সেভ: ১২
- লাল কার্ড: এনজো ফের্নান্দেস
- নির্ধারিত সময়ের ফল: ০-০
১৬ বছর পর স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ
২০১০ সালের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোলে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল স্পেন। ১৬ বছর পরে আবারও অতিরিক্ত সময়ের গোলেই এল তাদের দ্বিতীয় শিরোপা। পুরো প্রতিযোগিতায় আটটি ম্যাচ খেলেছে স্পেন। এই আট ম্যাচে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে। বিশ্বকাপজয়ী কোনও দলের জন্য এটি নতুন রক্ষণাত্মক রেকর্ড। ফাইনাল জয়ের ফলে স্পেনের অপরাজিত থাকার ধারাও ৩৮ ম্যাচে পৌঁছেছে। মহিলাদের ২০২৩ বিশ্বকাপ জয়ের পরে পুরুষদের বিশ্বকাপও এখন স্পেনের দখলে। একই সময়ে পুরুষ ও মহিলা—দুই বিভাগের বিশ্বকাপ ধরে রাখা প্রথম দেশ হয়েছে স্পেন। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও নতুন নজির গড়েছেন। ৬৫ বছর বয়সে বিশ্বকাপজয়ী সবচেয়ে বেশি বয়সী কোচ হয়েছেন তিনি।
অপূর্ণ রইল মেসির দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্ন
২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জেতার পরে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ ছিল আর্জেন্টিনার সামনে। সফল হলে ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পরে প্রথম দল হিসেবে টানা দু’টি বিশ্বকাপ জিতত তারা। কিন্তু স্পেনের বলের দখল ও সংগঠিত রক্ষণের সামনে আক্রমণে স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পায়নি আর্জেন্টিনা। ৩৯ বছর বয়সী মেসিও ফাইনালে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি। এটিই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ কি না, সে বিষয়ে মেসি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা করেননি। তবে তৃতীয়বার বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেও দ্বিতীয়বার শিরোপা জেতা হলো না আর্জেন্টাইন অধিনায়কের।
একনজরে বিশ্বকাপের ব্যক্তিগত পুরস্কার:
-
গোল্ডেন বল (টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়): রদ্রি (স্পেন)
-
গোল্ডেন গ্লাভস (সেরা গোলরক্ষক): উনাই সিমোন (স্পেন)
-
গোল্ডেন বুট (সর্বোচ্চ গোলদাতা): কিলিয়ান এমবাপে (ফ্রান্স, ১০ গোল)
-
সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়: পাউ কুবারসি (স্পেন, ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার)
