দেশ

ভারতে প্রথম ডেঙ্গু টিকা অনুমোদিত, কারা নিতে পারবেন ‘কিউডেঙ্গা’?

নয়াদিল্লি: ডেঙ্গু প্রতিরোধে ভারতে প্রথম টিকা ব্যবহারের অনুমোদন মিলল। ভারতের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘কিউডেঙ্গা’ নামের টিকাটি বাজারজাত করার অনুমতি দিয়েছে। টিকাটি তৈরি করেছে টাকেডা বায়োফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডিয়া। সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চার থেকে ৬০ বছর বয়সিরা এই টিকা নিতে পারবেন। আগে ডেঙ্গু হয়েছিল কি না, তার উপর অনুমোদন নির্ভর করছে না। টিকা নেওয়ার আগে ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাস জানার জন্য বাধ্যতামূলক রক্তপরীক্ষারও প্রয়োজন নেই। তবে বাজারজাত করার অনুমোদন পাওয়ার অর্থ এই নয় যে টিকাটি অবিলম্বে দেশের সরকারি টিকাকরণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। ভারতে এর দাম, বাজারে আসার নির্দিষ্ট দিন এবং সরকারি কর্মসূচিতে দেওয়া হবে কি না, এসব এখনও জানানো হয়নি।

কতটি ডোজ নিতে হবে?

কিউডেঙ্গা একটি জীবিত কিন্তু দুর্বল করা ভাইরাস দিয়ে তৈরি টিকা। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন-ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩ ও ডেনভি-৪-এর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য টিকাটি তৈরি হয়েছে। একটি সম্পূর্ণ টিকাক্রমে দুটি ডোজ নিতে হয়। প্রতিটি ডোজের পরিমাণ ০.৫ মিলিলিটার। প্রথম ডোজের তিন মাস পরে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। টিকাটি চামড়ার নীচে দেওয়া হয়। কোনও ব্যক্তি আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হলেও ভারতের অনুমোদিত বয়সসীমার মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শে টিকাটি নিতে পারবেন বলে সংস্থা জানিয়েছে।

পরীক্ষায় কতটা কার্যকর?

টিকাটির প্রস্তুতকারক সংস্থার দেওয়া শেষ পর্যায়ের পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ডোজের এক বছর পরে উপসর্গ-সহ নিশ্চিত ডেঙ্গু প্রতিরোধে কিউডেঙ্গার কার্যকারিতা ছিল ৮০.২ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজের পর ১৮ মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকারিতা ছিল ৯০.৪ শতাংশ।  তবে এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে টিকা নিলে কারও ডেঙ্গু হবে না। ব্যক্তির বয়স, আগের সংক্রমণ, এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ভাইরাসের ধরন এবং দ্বিতীয় ডোজ সম্পূর্ণ হয়েছে কি না, এসবের উপর সুরক্ষার মাত্রা বদলাতে পারে।

সংস্থার দাবি, সাত বছর ধরে সংগ্রহ করা তথ্যেও ডেঙ্গু ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা বজায় থাকার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। বিশ্বজুড়ে ১৯টি বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষায় ২৮ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন। ভারতে চার থেকে ৬০ বছর বয়সিদের নিয়ে তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষাও করা হয়েছে।

WHO-র পরামর্শ কী?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিউডেঙ্গাকে প্রয়োজনীয় মান, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের পরে আগাম স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে ইউনিসেফ-সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে টিকাটি সংগ্রহ করতে পারে।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমান পরামর্শ ভারতের বাজারজাতকরণের অনুমোদনের তুলনায় সীমিত। সংস্থাটি বেশি ডেঙ্গু সংক্রমণ হয় এমন এলাকায় মূলত ছয় থেকে ১৬ বছর বয়সি শিশু ও কিশোরদের নিয়মিত টিকাকরণ কর্মসূচিতে কিউডেঙ্গা ব্যবহারের কথা বলেছে। ছয় বছরের কম বয়সিদের জন্য সরকারি কর্মসূচিতে এর ব্যবহার এখনই সুপারিশ করা হয়নি।

অতএব, ভারতে চার থেকে ৬০ বছর বয়সিদের জন্য অনুমোদন থাকলেও সবার জন্য নির্বিচারে টিকা নেওয়ার পরামর্শ হিসেবে বিষয়টি দেখা ঠিক হবে না। বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং এলাকার ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

কারা সতর্ক থাকবেন?

কিউডেঙ্গা জীবিত কিন্তু দুর্বল করা ভাইরাসের টিকা। আন্তর্জাতিক ব্যবহারের বর্তমান নির্দেশিকা অনুযায়ী, গর্ভবতী মহিলা, সন্তানকে স্তন্যপান করাচ্ছেন এমন মহিলা এবং গুরুতরভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া ব্যক্তিদের সাধারণত এই টিকা দেওয়া হয় না। টিকার কোনও উপাদানে গুরুতর অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলেও আগে চিকিৎসককে জানাতে হবে। জ্বর বা গুরুতর অসুস্থতার সময় টিকা কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। ভারতে অনুমোদিত ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা প্রকাশিত হলে নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতার বিষয়গুলি আরও স্পষ্ট হবে। নিজে থেকে টিকা কেনা বা নেওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই নিরাপদ।

ভারতেই উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা

টিকার উৎপাদন বাড়াতে ভারতীয় টিকা প্রস্তুতকারক সংস্থা বায়োলজিক্যাল ই-র সঙ্গে চুক্তি করেছে টাকেডা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভারতীয় সংস্থাটি বছরে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি ডোজ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করবে। এর মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে বছরে দশ কোটি ডোজ সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। টাকেডার দাবি, ২০২২ সালে প্রথম অনুমোদনের পর কিউডেঙ্গা ৪৩টি দেশে অনুমোদিত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে তিন কোটি ২০ লক্ষের বেশি ডোজ সরবরাহ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা ডেঙ্গুর গুরুতরতা ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে জমা জল পরিষ্কার করা, মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা, নজরদারি এবং দ্রুত চিকিৎসার বিকল্প এটি নয়।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।