মেসির গোলে স্বপ্নভঙ্গ মিশরের, শেষ মুহূর্তে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
আটলান্টা: দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ মুহূর্তে অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিল আর্জেন্টিনা। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শেষ ষোলোর নাটকীয় লড়াইয়ে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল লিওনেল স্কালোনির দল। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে একসময় ০-২ গোলে পিছিয়ে ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু শেষ ১৫ মিনিটে বদলে যায় ম্যাচের ছবি। ৭৯ মিনিটে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোলে ব্যবধান কমে। ৮৩ মিনিটে গোল করে সমতা ফেরান লিওনেল মেসি। এরপর যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেসের হেড আর্জেন্টিনাকে ঐতিহাসিক জয় এনে দেয়।এই জয়ের ফলে কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা।
এক নজরে
- মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা
- ১৫ মিনিটে ইয়াসের ইব্রাহিম মিশরকে এগিয়ে দেন
- ৬৭ মিনিটে মুস্তাফা জিকোর গোলে ব্যবধান ২-০ হয়
- ৭৯ মিনিটে রোমেরো, ৮৩ মিনিটে মেসি এবং যোগ করা সময়ে এনজো গোল করেন
- মেসি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা ষষ্ঠ ম্যাচে গোল করলেন
শুরুতেই ধাক্কা আর্জেন্টিনার
ম্যাচের শুরুটা আর্জেন্টিনার জন্য মোটেই ভালো ছিল না। ১৫ মিনিটে মারওয়ান আতিয়ার ক্রস থেকে হেডে গোল করেন ইয়াসের ইব্রাহিম। লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে পেছনে ফেলে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। গোল খাওয়ার পর আর্জেন্টিনা দ্রুত সমতায় ফেরার সুযোগ পেয়েছিল। মিশরের বক্সে নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু মেসির শট আটকে দেন মিশরের গোলরক্ষক মুস্তাফা শোবেইর। এরপর মেসির একটি শট পোস্টে লাগে। জুলিয়ান আলভারেসের কাছ থেকে আসা আরও একটি সুযোগও রুখে দেন শোবেইর। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা বলের দখল রাখলেও মিশরের রক্ষণ এবং গোলরক্ষকের দৃঢ়তায় গোল পায়নি।
মিশরের দ্বিতীয় গোল, অঘটনের গন্ধ
দ্বিতীয়ার্ধেও মিশর নিজেদের পরিকল্পনা ধরে রাখে। দ্রুত পাল্টা আক্রমণে বারবার আর্জেন্টিনার রক্ষণকে চাপে ফেলে তারা। একবার মুস্তাফা জিকো বল জালে পাঠালেও ভিডিও পরীক্ষার পর সেই গোল বাতিল হয়। কিন্তু ৬৭ মিনিটে আর আটকানো যায়নি তাঁকে। পাল্টা আক্রমণ থেকে কাছ থেকে গোল করে মিশরকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন জিকো। সেই সময় মনে হচ্ছিল, বড় অঘটন ঘটতে চলেছে। প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠে মিশর বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিদায়ের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
শেষ ১৫ মিনিটে বদলে গেল ম্যাচ
৭৫ মিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পরও আর্জেন্টিনা দুই গোলে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। ৭৯ মিনিটে মেসির পাস থেকে গোল করেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। এই গোলের পর আর্জেন্টিনা নতুন আত্মবিশ্বাস পায়। মিশর তখনও এগিয়ে থাকলেও চাপ স্পষ্ট বাড়তে থাকে। মাত্র চার মিনিট পর গোল করেন মেসি। ৮৩ মিনিটে তাঁর গোলেই ২-২ সমতা ফেরে। এই গোল শুধু আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে ফেরায়নি, মেসির ব্যক্তিগত রেকর্ডেও নতুন অধ্যায় যোগ করে। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা ষষ্ঠ ম্যাচে গোল করলেন তিনি।
এনজোর হেডে ঐতিহাসিক জয়
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ে যাবে বলে মনে হচ্ছিল, তখনই আসে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোল। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে হেডে গোল করেন এনজো ফার্নান্দেস। এই গোলেই ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। শেষ মুহূর্তে মিশর সমতা ফেরানোর চেষ্টা করলেও আর পারেনি। শেষ বাঁশি বাজতেই আর্জেন্টিনা শিবিরে স্বস্তি, আর মিশর শিবিরে হতাশা নেমে আসে। বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে ৭৫ মিনিটে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জয়ের নজির বিরল। এই ম্যাচ তাই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিশেষ জায়গা পাবে।
মেসির রেকর্ড ও শেষ বিশ্বকাপের আবেগ
৩৯ বছর বয়সী মেসির জন্য এই বিশ্বকাপকে অনেকেই তাঁর শেষ বড় মঞ্চ হিসেবে দেখছেন। সেই কারণেই মিশরের বিরুদ্ধে ম্যাচটি আরও আবেগঘন হয়ে উঠেছিল। এই টুর্নামেন্টে মেসির গোলসংখ্যা এখন ৮। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও তিনি এগিয়ে গেলেন। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে মোট গোলের তালিকাতেও নিজের অবস্থান আরও শক্ত করলেন তিনি। প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস, পোস্টে বল লাগা—সব মিলিয়ে একসময় ম্যাচটি মেসির জন্য হতাশার হতে পারত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিই আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে থাকলেন।
মিশরের লড়াই প্রশংসনীয়
হারলেও মিশরের লড়াইকে ছোট করে দেখা যাবে না। প্রথমবার নকআউট পর্বে উঠে তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দীর্ঘ সময় চাপে রেখেছিল। ইয়াসের ইব্রাহিম ও মুস্তাফা জিকোর গোল মিশরকে বড় স্বপ্ন দেখিয়েছিল। গোলরক্ষক মুস্তাফা শোবেইরও দুর্দান্ত খেলেন। মেসির পেনাল্টি রুখে দিয়ে তিনি ম্যাচের শুরুতেই আর্জেন্টিনার উপর চাপ বাড়িয়ে দেন। তবে বড় ম্যাচে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা বড় হয়ে দাঁড়াল। শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনা সেই জায়গাতেই মিশরকে ছাপিয়ে গেল।
সামনে সুইজারল্যান্ড পরীক্ষা
এই জয়ের ফলে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। ম্যাচটি হবে কানসাস সিটি, মিসৌরিতে। তবে মিশরের বিরুদ্ধে এই ম্যাচ আর্জেন্টিনাকে সতর্কও করে দিল। রক্ষণে ভুল, প্রথমার্ধে সুযোগ নষ্ট এবং ধীর শুরু—এই বিষয়গুলো ঠিক করতে হবে স্কালোনির দলকে। বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্ন এখনও বেঁচে আছে আর্জেন্টিনার। কিন্তু সামনে পথ আরও কঠিন। মেসি আবারও দলকে বাঁচালেন, এখন দেখার কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা কতটা প্রস্তুত থাকে।
