দেশ

অরুণাচল নিয়ে চিনা দাবির জবাব রিজিজুর, অবস্থান স্পষ্ট করল ভারত

অরুণাচল প্রদেশে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বা PLA-র অনুপ্রবেশের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সীমান্তবর্তী একটি স্থানীয় সংগঠনের দাবির পর বিষয়টি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলে গুরুত্ব পায়। তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং অরুণাচল পশ্চিমের সাংসদ কিরেন রিজিজু স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভারতীয় ভূখণ্ডে চিনা সেনার কোনও অনুপ্রবেশ ঘটেনি।

ভারতীয় সেনাও সাম্প্রতিক কয়েকটি রিপোর্টের বিরোধিতা করে জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশে চিনা সেনা নতুন করে ভারতীয় ভূখণ্ড দখল করেছে বা শিবির গড়েছে—এমন দাবি ভিত্তিহীন। সেনার বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত পরিস্থিতি নজরে রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সতর্কতা বজায় রয়েছে।

এক নজরে:
• অরুণাচলে PLA অনুপ্রবেশের অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক
• কিরেন রিজিজুর দাবি, ভারতীয় ভূখণ্ডে কোনও অনুপ্রবেশ হয়নি
• সেনা জানিয়েছে, নতুন করে চিনা শিবির বা দখলের দাবি ভিত্তিহীন
• স্থানীয় সংগঠনের অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা
LAC পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেও সংবেদনশীল বলে সেনার মত

কী নিয়ে শুরু হয়েছিল বিতর্ক?

সম্প্রতি অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার একটি সীমান্তবর্তী স্থানীয় সংগঠন দাবি করে, গত কয়েক বছরে তাদের পৈতৃক চারণভূমি, কৃষিজমি এবং শিকারক্ষেত্রের কিছু অংশে চিনা সেনার উপস্থিতি বেড়েছে। সংগঠনের দাবি অনুযায়ী, সীমান্তের কাছে PLA পরিকাঠামোও তৈরি করেছে।

এই অভিযোগ সামনে আসতেই বিষয়টি জাতীয় স্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। বিভিন্ন মহল থেকে ঘটনার সরকারি তদন্ত ও সত্যতা যাচাইয়ের দাবি ওঠে। তবে ভারতীয় সেনা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট, সরকারি স্তরে এই অভিযোগের সত্যতা এখনও মেলেনি।

আরো পড়ুন: রিষড়া রামনবমী অশান্তি মামলায় NIA-র বড় পদক্ষেপ, গ্রেফতার তৃণমূল কাউন্সিলার শাকির আলি

কী বললেন কিরেন রিজিজু?

কিরেন রিজিজু জানিয়েছেন, ভারতীয় ভূখণ্ডে কোনও চিনা অনুপ্রবেশ হয়নি। তাঁর বক্তব্য, ভারত-চিন সীমান্তের বহু অংশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত নয়। তাই বাস্তব নিয়ন্ত্রণরেখা বা LAC বরাবর দুই দেশের সেনা কখনও কখনও নিজেদের দাবি করা এলাকায় টহল দিতে গিয়ে একে অপরের ধারণাকৃত সীমারেখা অতিক্রম করে।

রিজিজুর মতে, এই ধরনের ঘটনাকে “transgression” বলা যায়, কিন্তু সেটিকে সরাসরি “intrusion” বা অনুপ্রবেশ বলা ঠিক নয়। তাঁর বক্তব্য, সীমান্তের ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই প্রতিটি ঘটনাকে জমি দখল বা অনুপ্রবেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।

সেনারও একই অবস্থান

ভারতীয় সেনা জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশে চিনা সেনা নতুন করে ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছে বা শিবির স্থাপন করেছে—এমন রিপোর্ট বাস্তবভিত্তিক নয়। সেনার বক্তব্য, সীমান্তে পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চলছে।

সেনা সূত্রে আরও জানা যায়, যেকোনও বিভ্রান্তি এড়াতে এবং সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে ভারত ও চিনের সেনার মধ্যে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় থাকে। স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝি দ্রুত মেটানো হয়।

সীমান্তে পরিকাঠামো উন্নয়নে জোর

কিরেন রিজিজু সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিকাঠামো উন্নয়নের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, অতীতের তুলনায় বর্তমানে অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় সড়ক, সেতু, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত পরিকাঠামো অনেক দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত এলাকায় উন্নত পরিকাঠামো শুধু স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করে না, জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সেনা মোতায়েন, সরঞ্জাম পরিবহণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগ বজায় রাখতে এই ধরনের পরিকাঠামো বড় ভূমিকা নেয়।

ভারত-চিন সীমান্তে সংলাপও চলছে

সীমান্তে সতর্কতা বজায় রাখার পাশাপাশি ভারত ও চিনের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ের আলোচনাও চলছে। সম্প্রতি বেজিংয়ে ভারত-চিন সীমান্ত বিষয়ক Working Mechanism for Consultation and Coordination বা WMCC-এর ৩৫তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশই সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা এড়াতে যোগাযোগের পথ খোলা রাখার গুরুত্বের কথা তুলে ধরে।

সেনাপ্রধানের বার্তা

বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীও সম্প্রতি বলেছেন, LAC পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল হলেও সংবেদনশীল। তাঁর বক্তব্য, ভারত ও চিনের সেনার মধ্যে বছরে এক হাজারেরও বেশি স্থানীয় পর্যায়ের যোগাযোগ হয়। এই ধরনের যোগাযোগ সীমান্তে ভুল বোঝাবুঝি কমাতে সাহায্য করে।

তিনি আরও জানিয়েছেন, সেনা সংলাপের পথকে গুরুত্ব দিলেও ভারতের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে কোনও আপস করা হবে না। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মোতায়েন ও প্রস্তুতিও জারি থাকবে।

শেষ কথা

অরুণাচল প্রদেশে চিনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হলেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ভারতীয় সেনা সেই দাবি খারিজ করেছে। স্থানীয় সংগঠনের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হলেও, সরকারি অবস্থান অনুযায়ী নতুন করে কোনও চিনা দখল বা শিবির স্থাপনের প্রমাণ সামনে আসেনি।

তবে ভারত-চিন সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই সংবেদনশীল। তাই LAC বরাবর পরিস্থিতি নজরে রাখা, স্থানীয় অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সীমান্তে পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক সংলাপ—এই সব দিকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আপাতত কেন্দ্র ও সেনার বার্তা স্পষ্ট: সীমান্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে সতর্কতা অব্যাহত থাকবে।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।