আন্তর্জাতিক

বেলুচিস্তানে স্বাধীনতার ঘোষণা, অনিশ্চয়তার মুখে চিনের ৬৫ বিলিয়ন ডলারের সিপিইসি প্রকল্প

পাকিস্তান থেকে বালুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করে সামাজিক মাধ্যমে একটি বিবৃতি ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে ‘রিপাবলিক অব বালুচিস্তান’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রসংঘ-সহ আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি চাওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘোষণাটি প্রকাশ করলেই কোনও অঞ্চল স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায় না।

এখনও কোনও দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা বালুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণও আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়নি। ফলে বর্তমান আন্তর্জাতিক অবস্থান অনুযায়ী বালুচিস্তান এখনও পাকিস্তানেরই একটি প্রদেশ।

ভাইরাল বিবৃতিটি কোনও নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার, সর্বদলীয় বালুচ প্রতিনিধি পরিষদ বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে প্রকাশিত নয়। বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা ও লেখক মীর ইয়ার বালুচের সঙ্গে ঘোষণাটির যোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাই ‘বালুচিস্তান স্বাধীন হয়ে গিয়েছে’ না লিখে একে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের স্বাধীনতার দাবি বলা সঠিক।

ঘোষণায় আসলে কী বদলেছে?

আইনগতভাবে এখনও কোনও আন্তর্জাতিক সীমান্ত পরিবর্তিত হয়নি। বালুচিস্তানের প্রশাসন, বিমানবন্দর, বন্দর এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।

স্বাধীনতার দাবিদার পক্ষ বালুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করার কথাও বলেছে। কিন্তু এই দাবির সমর্থনে নির্ভরযোগ্য মানচিত্র, স্বাধীন পর্যবেক্ষকের তথ্য বা আন্তর্জাতিক সংস্থার নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ফলে ওই পরিসংখ্যান প্রকাশ করলে সেটিকে অযাচাইকৃত দাবি হিসেবেই উল্লেখ করতে হবে।

তবে ঘোষণাটি সম্পূর্ণ গুরুত্বহীনও নয়। বালুচিস্তানে বহু বছর ধরে চলা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সাম্প্রতিক সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের মধ্যে এটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ।

কেন আলোচনায় CPEC?

বালুচিস্তানে রয়েছে চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ—গ্বাদর বন্দর। CPEC হল চিনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অধীনে তৈরি সড়ক, বিদ্যুৎ, বন্দর ও অন্যান্য পরিকাঠামো প্রকল্পের সমষ্টি।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বালুচিস্তানের আরব সাগর উপকূলে অবস্থিত গ্বাদরের সঙ্গে চিনের শিনজিয়াং অঞ্চলকে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। CPEC-তে মোট বিনিয়োগের অঙ্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন হিসাব সামনে এসেছে; বহুল প্রচলিত অনুমান প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ বিলিয়ন ডলার।

স্বাধীনতার ঘোষণার পরে CPEC বন্ধ হয়ে যায়নি। পাকিস্তান ও চিনও সম্প্রতি করিডরের কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং গ্বাদরকে আঞ্চলিক যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। চিন–পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অবস্থান

গ্বাদর বন্দর এখন কার নিয়ন্ত্রণে?

গ্বাদর বন্দরের মালিকানা পাকিস্তানের গ্বাদর পোর্ট অথরিটির হাতে। তবে ২০১৩ সালের চুক্তি অনুযায়ী ৪০ বছরের জন্য বন্দরের পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা চায়না ওভারসিজ পোর্টস হোল্ডিং কোম্পানি।

অর্থাৎ চিন বন্দরটি পরিচালনা করলেও গ্বাদরের উপর চিনের সার্বভৌম অধিকার নেই। পরিচালনার চুক্তি এবং ভূখণ্ডের মালিকানা এক বিষয় নয়। বন্দর পরিচালনাকারী সংস্থার তথ্য

বালুচিস্তান ভবিষ্যতে সত্যিই আন্তর্জাতিক স্বীকৃত স্বাধীন রাষ্ট্র হলে গ্বাদর তার ভূখণ্ডের মধ্যে পড়তে পারে। কিন্তু তখন বন্দরের পরিচালন চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা বহাল থাকবে—কোনওটিই এখন থেকে নিশ্চিত করে বলা যায় না।

স্বাধীন হলে চিনের চুক্তির কী হবে?

এটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি। কোনও নতুন রাষ্ট্র তৈরি হলে আগের রাষ্ট্রের চুক্তি, ঋণ, সম্পত্তি ও দায় কীভাবে ভাগ হবে, তা কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা অর্জনের পদ্ধতি, পাকিস্তানের সম্মতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, সংশ্লিষ্ট চুক্তির ভাষা এবং দুই পক্ষের পরবর্তী আলোচনা।

সম্ভাব্য নতুন সরকার পুরনো বাণিজ্যিক চুক্তি বহাল রাখতে, নতুন শর্তে আলোচনা করতে বা আইন মেনে বাতিলের চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু কোনও চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করা হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ক্ষতিপূরণ চাইতে বা আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ায় যেতে পারে।

একইভাবে পাকিস্তানের নেওয়া ঋণে তৈরি সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্যান্য পরিকাঠামোর মালিকানা এবং দেনার ভাগ নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন হবে। তাই ‘স্বাধীন হলেই CPEC শেষ’—এই সিদ্ধান্তও অতিসরলীকরণ।

এখনই চিনের বড় উদ্বেগ কোথায়?

এই মুহূর্তে আইনি মালিকানার তুলনায় নিরাপত্তাই চিনের বড় উদ্বেগ। বালুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলি অতীতে চিনা নাগরিক ও CPEC-সংক্রান্ত প্রকল্পে একাধিক হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

হামলা বাড়লে প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যয়, বিমা খরচ এবং নির্মাণের সময় বৃদ্ধি পেতে পারে। চিনা কর্মীদের চলাচলেও নতুন বিধিনিষেধ আসতে পারে। ইতিমধ্যে নিরাপত্তাজনিত সমস্যায় চিন পরিচালিত সাইন্দাক তামা ও সোনার খনির কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় অসন্তোষের কারণ কী?

বালুচ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলির দীর্ঘদিনের অভিযোগ, প্রদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কৌশলগত অবস্থানের সুফল স্থানীয় মানুষের কাছে যথেষ্ট পৌঁছয়নি। কাজের সুযোগ, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, মৎস্যজীবীদের জীবিকা এবং উন্নয়নের অসম বণ্টন নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে।

গ্বাদর পোর্ট অথরিটি ২০২৫ সালে বালুচিস্তান সরকারকে জানিয়েছিল, বন্দর থেকে পাওয়া রাজস্বের কোনও সরাসরি অংশ প্রদেশ পায় না। প্রচলিত চুক্তি অনুযায়ী বন্দরের আয়ের ৯১ শতাংশ পরিচালনাকারী চিনা সংস্থা এবং ৯ শতাংশ গ্বাদর পোর্ট অথরিটি পায় বলে অতীতে পাকিস্তানের সংসদে জানানো হয়েছিল।

স্বাধীনতার ভাইরাল ঘোষণা এখনই CPEC বা গ্বাদরের আইনগত অবস্থান বদলায়নি। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে চিনের বিনিয়োগ ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা ভূখণ্ডের কার্যকর নিয়ন্ত্রণে বড় পরিবর্তন ঘটলেই কেবল চুক্তিগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস্তব আলোচনা শুরু হবে।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।