যেখানে হাত দিচ্ছি সেখানেই ধ্বংসলীলা’, মমতাকে আক্রমণ শুভেন্দুর
জাতীয় চিকিৎসক দিবস এবং বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা কিংবদন্তি চিকিৎসক ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার সল্টলেকে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ডা. রায়ের কর্মজীবন, প্রশাসনিক দূরদৃষ্টি এবং বাংলার স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গঠনে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেন তিনি।
একই মঞ্চ থেকে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা, হাসপাতাল পরিকাঠামো এবং চিকিৎসা ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে কড়া বার্তাও দেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এক নজরে:
• জাতীয় চিকিৎসক দিবসে ডা. বিধানচন্দ্র রায়কে শ্রদ্ধা শুভেন্দু অধিকারীর
• বিধাননগর সাব-ডিভিশনাল হাসপাতালের নতুন নাম ঘোষণা
• হাসপাতালের নতুন নাম ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল
• স্বাস্থ্য পরিষেবায় রাজনৈতিক প্রভাবের বিরোধিতা করেন মুখ্যমন্ত্রী
• পূর্বতন সরকারের স্বাস্থ্যনীতি নিয়েও কড়া সমালোচনা
বিধানচন্দ্র রায়ের অবদান স্মরণ
ডা. বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু—দুটিই ১ জুলাই। তাঁর স্মৃতিতেই ভারতে জাতীয় চিকিৎসক দিবস পালিত হয়।
ডা. রায়ের অবদানের কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, আধুনিক বাংলার স্বাস্থ্য, নগর এবং নাগরিক পরিকাঠামোর ভিত্তি গড়তে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিধাননগর, দুর্গাপুর, কল্যাণী-সহ একাধিক পরিকল্পিত উন্নয়ন ভাবনার সঙ্গে ডা. রায়ের নাম জড়িয়ে রয়েছে।
আরো পড়ুন: ব্যাঙ্কের কাজ আছে? জুলাই মাসের ছুটির তালিকা দেখে তবেই বেরোন
জ্যোতি বসুর মন্তব্য টেনে শুভেন্দুর বার্তা
বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর একটি মন্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জ্যোতি বসু একসময় বলেছিলেন, তিনি যখনই কোনও কাজ শুরু করতে যেতেন, দেখতেন সেই কাজের ভিত্তি ডা. বিধানচন্দ্র রায় আগেই তৈরি করে গিয়েছেন।
এই প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু বলেন, বর্তমান সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্র পর্যালোচনা করতে গিয়ে উল্টো চিত্র দেখছে। তাঁর দাবি, যেখানে হাত দেওয়া হচ্ছে, সেখানেই পূর্বতন সরকারের আমলের অব্যবস্থা ও ক্ষতির ছবি সামনে আসছে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রাজনীতির জায়গা নেই
স্বাস্থ্য পরিষেবাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংকীর্ণতা, গোষ্ঠীভিত্তিক প্রভাব বা ‘আমরা-ওরা’ মানসিকতার কোনও স্থান থাকা উচিত নয়।
তিনি অভিযোগ করেন, পূর্বতন সরকারের সময় স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে একাধিক অনিয়ম, অব্যবস্থা এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এই ধরনের অভিযোগ তদন্ত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেও প্রশাসনিক মহলের একাংশ মনে করছে।
হাসপাতালের নতুন নাম ঘোষণা
চিকিৎসক দিবসের অনুষ্ঠানে বিধাননগর সাব-ডিভিশনাল হাসপাতালের নতুন নাম ঘোষণা করা হয়। হাসপাতালটির নাম রাখা হয়েছে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল। প্রশাসনিক সূত্রে দাবি, শুধু নাম পরিবর্তন নয়, আগামী দিনে হাসপাতালটিকে আরও উন্নত পরিষেবা-সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
বাংলার মানুষ বাইরে চিকিৎসা নিতে যাবে কেন?
শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, বাংলার মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য রাজ্যে যেতে হলে তা উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক পরিকাঠামো, দক্ষ প্রশাসন এবং চিকিৎসকদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাতেই উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া সম্ভব।
তিনি সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা পরিষেবার মান বৃদ্ধি এবং রোগী-কেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনার উপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্য, স্বাস্থ্য পরিষেবা এমন হওয়া উচিত যাতে সাধারণ মানুষ নিজের রাজ্যেই ভরসা পান।
আয়ুষ্মান ভারত নিয়েও বার্তা
অনুষ্ঠানে রাজ্যে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু করার প্রসঙ্গও উঠে আসে। শুভেন্দু দাবি করেন, ক্ষমতায় আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এই প্রকল্প চালু করা হয়েছে এবং দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা পরিষেবায় তা সহায়ক হবে।
সরকারের দাবি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য ও স্বচ্ছ করতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের প্রকল্পগুলিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। তবে বাস্তবে এই প্রকল্পের সুবিধা কত দ্রুত ও কত মানুষের কাছে পৌঁছয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা
ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে তিনি বাংলার স্বাস্থ্য পরিষেবার ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে পূর্বতন সরকারের স্বাস্থ্যনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য পরিষেবা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, পরিষেবার মান এবং রোগীর অধিকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আগামী দিনে হাসপাতালের নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি বাস্তব পরিষেবা কতটা উন্নত হয়, সেটাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
