১৫ জুলাই থেকে কার্যকর ভারত–ব্রিটেন বাণিজ্য চুক্তি, ব্যবসা ও কর্মীদের কী সুবিধা?
নয়াদিল্লি, ১৩ জুলাই: আর দু’দিন পর থেকেই কার্যকর হতে চলেছে ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তি। আগামী ১৫ জুলাই থেকে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা নতুন শুল্কসুবিধা এবং বাজারে প্রবেশের নিয়ম ব্যবহার করতে পারবেন। একই দিনে সাময়িকভাবে অন্য দেশে কাজে যাওয়া কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা অবদান সংক্রান্ত পৃথক চুক্তিও চালু হবে।
কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৯৯ শতাংশ রপ্তানি শুল্কশ্রেণি ব্রিটেনের বাজারে শূন্য শুল্কের সুবিধা পাবে। এর আওতায় ভারতের প্রায় সম্পূর্ণ রপ্তানি-বাণিজ্য মূল্য চলে আসবে। বস্ত্র, পোশাক, চামড়া, জুতো, সামুদ্রিক খাদ্য, প্রকৌশল সামগ্রী, ওষুধ এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের মতো ক্ষেত্রগুলি এতে লাভবান হতে পারে।
এক নজরে
- চুক্তি কার্যকর হবে ১৫ জুলাই ২০২৬
- ভারতীয় রপ্তানির প্রায় ৯৯ শতাংশ শুল্কশ্রেণিতে শূন্য শুল্কের সুযোগ
- তথ্যপ্রযুক্তি-সহ ১৩৭টি পরিষেবা ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশ সহজ হতে পারে
- সাময়িকভাবে পাঠানো যোগ্য কর্মীরা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর দ্বৈত সামাজিক সুরক্ষা অবদান থেকে ছাড় পাবেন
- এই ছাড় ব্রিটেনে চাকরি করা সব ভারতীয়ের জন্য নয়
- শুল্কসুবিধা পেতে পণ্যের উৎস ও প্রয়োজনীয় নথির নিয়ম মানতে হবে
কোন ভারতীয় পণ্য বেশি সুবিধা পাবে?
চুক্তি চালু হলে ব্রিটেনে ভারতীয় পণ্যের উপর থাকা বেশ কয়েকটি আমদানি শুল্ক উঠে যাবে। সরকারি হিসাবে, প্রক্রিয়াজাত খাবারের কোনও কোনও পণ্যে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ শুল্ক ছিল। সামুদ্রিক পণ্যে সর্বোচ্চ ২১.৫ শতাংশ এবং প্রকৌশল পণ্য ও গাড়ির যন্ত্রাংশে সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ শুল্ক ছিল।
চামড়া ও জুতোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ, বস্ত্র ও পোশাকে ১২ শতাংশ এবং রাসায়নিক ও ওষুধজাত পণ্যে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে। এর ফলে ব্রিটেনের বাজারে যোগ্য ভারতীয় পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে শুল্ক কমলেই রপ্তানি নিশ্চিতভাবে বাড়বে, বিষয়টি এমন নয়। পণ্যের মান, মোড়ক, পরিবহণ খরচ, সময়মতো সরবরাহ এবং বিদেশি ক্রেতা পাওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষুদ্র ব্যবসার সামনে কী সুযোগ?
বিদেশে পণ্য পাঠানোর সময় ছোট ব্যবসাকে শুল্কের পাশাপাশি নথি তৈরি, মান পরীক্ষা, পরিবহণ এবং বিদেশি ক্রেতা খোঁজার খরচ বহন করতে হয়। শুল্ক কমলে তাদের মোট খরচের একটি অংশ কমতে পারে। বিশেষ করে পোশাক, চামড়ার সামগ্রী, হস্তশিল্প, প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্রকৌশল সামগ্রী এবং সামুদ্রিক পণ্যের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার সামনে ব্রিটেনের বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সরকারি তথ্যে নারী উদ্যোগপতি, নতুন ব্যবসা, কারিগর এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি সংস্থাকে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে কোন ব্যবসা কতটা সুবিধা পাবে, তা তার পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট শুল্কশ্রেণির উপর নির্ভর করবে।
শুধু ভারত থেকে পাঠালেই কি শুল্কছাড় মিলবে?
কোনও পণ্য ভারত থেকে ব্রিটেনে পাঠানো হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতীয় পণ্য হিসেবে শুল্কছাড় পাবে না। পণ্যটি ভারতে তৈরি হয়েছে বা চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী ভারতে যথেষ্ট উৎপাদন হয়েছে—সেটি প্রমাণ করতে হবে। কাঁচামালের উৎস, উৎপাদনের জায়গা, চালান এবং পণ্যের উৎস-ঘোষণার মতো নথি ঠিক রাখতে হবে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না হলে শুল্কছাড় আটকে যেতে পারে। চুক্তির সুবিধা দাবি করার জন্য উৎস-ঘোষণার তারিখ ১৫ জুলাই ২০২৬ বা তার পরে হতে হবে। তার আগের তারিখে তৈরি ঘোষণা নতুন চুক্তির অধীনে বাতিল হতে পারে।
পরিষেবা ক্ষেত্রে কী বদলাবে?
বাণিজ্য চুক্তি শুধু পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্রিটেন ভারতীয় ব্যবসার আগ্রহ রয়েছে এমন ১৩৭টি পরিষেবা ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর পরিষেবা, আর্থিক পরিষেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রকৌশল, টেলিযোগাযোগ, পরামর্শ এবং বিভিন্ন পেশাদার পরিষেবা। ব্যবসায়িক সফরকারী, সংস্থার ভিতরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বদলি হওয়া কর্মী, চুক্তিভিত্তিক পরিষেবা প্রদানকারী, স্বাধীন পেশাজীবী এবং বিনিয়োগকারীদের জন্যও নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে।
চুক্তিতে প্রতি বছর মোট ১,৮০০ ভারতীয় রাঁধুনি, যোগ প্রশিক্ষক এবং শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পীর জন্য বিশেষ চলাচলের সুযোগের কথাও বলা হয়েছে। তবে এটি সাধারণ কর্মভিসা নয়; নির্ধারিত যোগ্যতা ও অভিবাসন নিয়ম মানতে হবে।
ভারতীয় কর্মীদের পাঁচ বছরের সুবিধা কী?
১৫ জুলাই থেকে সামাজিক সুরক্ষা অবদান সংক্রান্ত চুক্তিও কার্যকর হবে। এর ফলে কোনও ভারতীয় সংস্থা তার কর্মীকে সাময়িকভাবে ব্রিটেনে পাঠালে, যোগ্য কর্মী সর্বোচ্চ ৬০ মাস পর্যন্ত একই সময়ে দুই দেশে সামাজিক সুরক্ষা বাবদ অর্থ দিতে বাধ্য হবেন না। এই সময় ওই কর্মী ব্রিটেনে আলাদা সামাজিক সুরক্ষা অবদান না দিয়ে ভারতের কর্মী ভবিষ্যনিধি ব্যবস্থায় অবদান চালিয়ে যেতে পারবেন। একই সুবিধা সাময়িকভাবে ভারতে পাঠানো ব্রিটিশ কর্মীদের ক্ষেত্রেও থাকবে।
কিন্তু এই ছাড় ব্রিটেনে কর্মরত প্রত্যেক ভারতীয়ের জন্য নয়। কোনও ব্যক্তি নিজে ব্রিটেনে গিয়ে নতুন চাকরি নিলে তাঁকে সেখানকার সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষা অবদান দিতে হবে।
সুবিধাটি মূলত তাঁদের জন্য, যাঁরা আগে থেকেই ভারতীয় সংস্থায় কর্মরত এবং সেই সংস্থা তাঁদের পাঁচ বছরের কম সময়ের জন্য ব্রিটেনে পাঠাচ্ছে। পাঁচ বছরের বেশি থাকার পরিকল্পনা থাকলেও শুরু থেকেই ব্রিটিশ নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকারের হিসাবে, এই ব্যবস্থায় ৭৫ হাজারের বেশি ভারতীয় পেশাজীবী এবং ৯০০টির বেশি সংস্থা উপকৃত হতে পারে। এগুলি সরকারি অনুমান; বাস্তবে কতজন সুবিধা পাবেন, তা আবেদন ও যোগ্যতার উপর নির্ভর করবে।
সাধারণ ক্রেতার কী লাভ হতে পারে?
চুক্তির ফলে ব্রিটেন থেকে ভারতে আসা কিছু পণ্যের শুল্কও কমবে। তবে ১৫ জুলাই থেকেই বাজারে সব ব্রিটিশ পণ্যের দাম কমে যাবে—এমন নয়। কোনও পণ্যের চূড়ান্ত দাম নির্ভর করে শুল্কের পাশাপাশি পরিবহণ খরচ, মুদ্রার বিনিময় হার, কর, আমদানিকারকের ব্যয় এবং বিক্রেতার সিদ্ধান্তের উপর। তাই সাধারণ ক্রেতার উপর প্রভাব বুঝতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
ব্রিটিশ সরকারের মতে, তাদের দেশেও ভারতীয় পোশাক, জুতো এবং কয়েক ধরনের খাদ্যপণ্যের উপর শুল্ক কমবে। এতে আমদানিকারকের খরচ কমতে পারে, তবে সেই সুবিধা ক্রেতার কাছে পুরোপুরি পৌঁছবে কি না, তা বাজারের উপর নির্ভর করবে।
ব্যবসায়ীদের এখন কী প্রস্তুতি প্রয়োজন?
যেসব সংস্থা ১৫ জুলাইয়ের পর নতুন চুক্তির অধীনে পণ্য পাঠাতে চায়, তাদের প্রথমে নিজেদের পণ্যের সঠিক শুল্কশ্রেণি জানতে হবে। পাশাপাশি পণ্যের উৎস প্রমাণের কাগজপত্র, চালান এবং শুল্ক সংক্রান্ত নথিও প্রস্তুত রাখতে হবে। শুল্কমুক্ত সুবিধা ব্যবসার খরচ কমাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু বিদেশি বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য পণ্যের মান, নিয়মিত সরবরাহ এবং ক্রেতার বিশ্বাস ধরে রাখা জরুরি।
ভারত–ব্রিটেন চুক্তি ভারতীয় ব্যবসা ও পেশাজীবীদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তবে বাস্তব সুবিধা পেতে চুক্তির নিয়ম বুঝে সঠিক নথি নিয়ে এগোনোটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রক, সরকারি তথ্য দপ্তর এবং ব্রিটিশ সরকারের বাণিজ্য ও সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশিকা।
