আন্তর্জাতিক

সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ফের চড়ল ভারত-পাকিস্তান সুর, পাকিস্তান মন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারি

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু জলচুক্তি বা Indus Waters Treaty ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়ছে। ২০২৫ সালের পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর ভারত চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছে ইসলামাবাদ। এবার এই বিতর্কে আরও কড়া মন্তব্য করলেন পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মুসাদিক মালিক।

পাকিস্তানের দাবি, সিন্ধু জলচুক্তি এখনও আইনগতভাবে কার্যকর এবং কোনও পক্ষ একতরফাভাবে তা বাতিল, স্থগিত বা সংশোধন করতে পারে না। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না হলে সহযোগিতার পুরনো কাঠামো আগের মতো চলতে পারে না।

এক নজরে:
• সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের কূটনৈতিক সংঘাত বাড়ছে
• পাকিস্তানের মন্ত্রী মুসাদিক মালিক জলের ভাগ নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন
• ভারত পহেলগাঁও হামলার পর চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়
• পাকিস্তান বলছে, চুক্তি একতরফা বাতিল বা বদলানো যায় না

পাকিস্তানের কড়া বার্তা

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারের সঙ্গে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে মুসাদিক মালিক ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, নয়াদিল্লি পাকিস্তানের জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনি দাবি করেন, প্রতিবেশী দেশের নেতৃত্ব এমন অবস্থান নিয়েছে যাতে পাকিস্তানে “এক ফোঁটা জলও” পৌঁছতে না পারে।

এরপরই তিনি আরও কড়া ভাষায় বলেন, পাকিস্তানের ভাগের জলের উপর কেউ দাবি জানালে বা তা আটকে দেওয়ার চেষ্টা করলে ইসলামাবাদ কঠোর জবাব দেবে। তাঁর মন্তব্যে স্পষ্ট, জল ইস্যুকে পাকিস্তান শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও দেখছে।

আরও পড়ুন: ঢাকা-সহ বাংলাদেশে কালেমা পতাকা, জঙ্গি-যোগের আশঙ্কা? কড়া নজর ভারতের

‘জল আমাদের রেড লাইন’

একই সাংবাদিক বৈঠকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেন, ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তি এখনও সম্পূর্ণ আইনগতভাবে কার্যকর। তাঁর বক্তব্য, কোনও পক্ষ একতরফাভাবে এই চুক্তি বাতিল, স্থগিত বা সংশোধন করতে পারে না।

তারার আরও বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির বারবার স্পষ্ট করেছেন যে, জল পাকিস্তানের জীবনরেখা এবং একই সঙ্গে রেড লাইন।

এই ইস্যুতে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ইসলামাবাদে সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজনের কথাও জানানো হয়েছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ সিন্ধু জলচুক্তি?

বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু জলচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী পূর্ব দিকের তিনটি নদী—রবি, বিপাশা বা বিয়াস এবং শতদ্রু—ব্যবহারের অধিকার ভারতের হাতে থাকে। অন্যদিকে পশ্চিমের তিনটি নদী—সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের জল ব্যবহারের প্রধান অধিকার পায় পাকিস্তান।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ, সীমান্ত সংঘর্ষ এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও এই চুক্তি বহু দশক ধরে টিকে ছিল। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক মহলে এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলবণ্টন চুক্তি হিসেবে দেখা হয়।

পহেলগাঁও হামলার পর বদল পরিস্থিতি

২০২৫ সালের এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ভারত এই হামলার সঙ্গে পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গি যোগের অভিযোগ তোলে। এরপর নয়াদিল্লি জানায়, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না হলে সিন্ধু জলচুক্তির কার্যকারিতা আগের মতো রাখা হবে না।

পাকিস্তান অবশ্য ভারতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইসলামাবাদের দাবি, জলচুক্তি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং তা একতরফাভাবে স্থগিত করা যায় না।

ভারতের অবস্থান

ভারত ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, ছয় দশকেরও বেশি পুরনো এই চুক্তি বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে আর পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নয়াদিল্লির বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদ ও সহযোগিতা একসঙ্গে চলতে পারে না। তাই নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ভারতীয় কূটনৈতিক অবস্থানে বারবার উঠে এসেছে, যে পরিবেশে এই চুক্তি হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে অনেকটাই আলাদা। বিশেষ করে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বেড়েছে।

বাড়ছে কূটনৈতিক উত্তেজনা

জলবণ্টন নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান ক্রমশ কঠোর হচ্ছে। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির বাধ্যবাধকতার কথা বলছে। অন্যদিকে ভারত নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদকে এই বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

ফলে সিন্ধু জলচুক্তি এখন শুধু জলবণ্টনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা নীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আগামী দিনে এই চুক্তি নিয়ে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *