খেলাধুলা

নরওয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় ব্রাজিলের, নেইমারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ইঙ্গিত

নিউ জার্সি: নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিল ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এই হার শুধু ফলাফলের জন্য নয়, নেইমারের আবেগঘন মুহূর্তের কারণেও ফুটবল দুনিয়ায় বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ম্যাচ শেষে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি নেইমার। ব্রাজিলের জার্সিতে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এমন বার্তা দিয়েছেন, যা একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাঁর জাতীয় দল থেকে বিদায়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে Reuters সতর্ক ভাষায় জানিয়েছে, নেইমার ব্রাজিলের হয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন; তাই এই মুহূর্তে এটিকে নিশ্চিত অবসর ঘোষণা না লিখে “বিদায়ের ইঙ্গিত” বলা সবচেয়ে নিরাপদ।

এক নজরে

  • রওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেল ব্রাজিল।
  • আর্লিং হালান্ডের দুই গোলে শেষ ষোলোয় বড় অঘটন ঘটায় নরওয়ে।
  • স্টপেজ টাইমে পেনাল্টি থেকে গোল করেন নেইমার, কিন্তু ব্রাজিলকে ফেরাতে পারেননি।
  • ম্যাচের পর আবেগঘন নেইমার জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিদায়ের ইঙ্গিত দেন।
  • Reuters অনুযায়ী, ব্রাজিলের হয়ে নেইমারের রেকর্ড ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল ও ৫৮ অ্যাসিস্ট।


কী ঘটেছিল ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচে?

শেষ ষোলোর ম্যাচে ব্রাজিলের সামনে ছিল নরওয়ে। ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও তারকাখ্যাতির বিচারে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও মাঠে নরওয়ে অনেক বেশি সংগঠিত ফুটবল খেলেছে। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আর্লিং হালান্ড দু’বার গোল করে ব্রাজিলকে বড় চাপে ফেলে দেন। Reuters ও Al Jazeera—দুই সূত্রেই হালান্ডের জোড়া গোল এবং নরওয়ের ২-১ জয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্রাজিল শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি পায়। সেই পেনাল্টি থেকে গোল করেন নেইমার। কিন্তু তখন ম্যাচ প্রায় শেষের পথে। গোলটি তাঁর ব্যক্তিগত অধ্যায়ে আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে থাকলেও, দলের জন্য তা সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছু হয়ে উঠতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত নরওয়ে ২-১ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায়।

নেইমার কী ইঙ্গিত দিলেন?

ম্যাচের পর নেইমারকে ভেঙে পড়তে দেখা যায়। আবেগঘন অবস্থায় তিনি জানান, তিনি চেষ্টা করেছেন, নিজের সবটুকু দিয়েছেন। তাঁর কথায় স্পষ্ট ছিল, ব্রাজিলের হয়ে দীর্ঘ পথচলার শেষ অধ্যায় হয়তো এসে গিয়েছে।

ESPN, Reuters-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই বক্তব্যকে নেইমারের ব্রাজিল অধ্যায়ের শেষের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে। তবে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন বা নেইমারের পক্ষ থেকে আলাদা কোনও বিস্তৃত আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা সব সূত্রে এখনও স্পষ্ট নয়। তাই রিপোর্টিংয়ের ভাষায় “অবসর ঘোষণা” না লিখে “বিদায়ের ইঙ্গিত” ব্যবহার করাই দায়িত্বশীল।

কেন এত আবেগঘন এই মুহূর্ত?

নেইমারের আন্তর্জাতিক ফুটবল শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। সেই সময় থেকেই তাঁকে ব্রাজিলের পরবর্তী বড় তারকা হিসেবে দেখা হয়েছিল। পেলে, রোনালদো, রোনালদিনহোর দেশের ফুটবলে প্রত্যাশা সবসময়ই বিরাট। সেই প্রত্যাশার ভার নিয়েই প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় জাতীয় দলের প্রধান মুখ ছিলেন নেইমার।

এই বিশ্বকাপে চোট ও ফিটনেসের প্রশ্ন পেরিয়ে তিনি মাঠে ফিরেছিলেন। নরওয়ের বিরুদ্ধে শেষ দিকে গোলও করেন। কিন্তু সেই গোল ব্রাজিলকে বাঁচাতে পারেনি। তাই তাঁর চোখের জল শুধু একটি ম্যাচ হারার জন্য নয়, দীর্ঘ এক অধ্যায়ের শেষের ইঙ্গিতও বয়ে আনল।

নেইমারের ব্রাজিল ক্যারিয়ার

ব্রাজিলের হয়ে নেইমারের পরিসংখ্যান অসাধারণ। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি জাতীয় দলের হয়ে ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল এবং ৫৮টি অ্যাসিস্ট করেছেন। কিছু অন্য প্রতিবেদনে ম্যাচ সংখ্যা ১২৯ বলা হয়েছে। পরিসংখ্যান গণনার পদ্ধতির কারণে এমন সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। তাই এই প্রতিবেদনে Reuters-এর ১৩০ ম্যাচের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ পুরুষ গোলদাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর অবস্থান অনেক আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছে। ২০১৩ সালে কনফেডারেশন্স কাপ জিতেছিলেন তিনি। ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলের সোনা জেতার পথেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে ওঠেনি।

বিশ্বকাপ কেন অধরাই রইল?

নেইমারের ক্যারিয়ার আলোয় ভরা হলেও বিশ্বকাপের গল্প বারবার হতাশায় শেষ হয়েছে। কখনও চোট, কখনও দলীয় ব্যর্থতা, কখনও বড় ম্যাচে সুযোগ হাতছাড়া—সব মিলিয়ে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে চোট তাঁকে শেষ দিকে ছিটকে দেয়। ২০১৮ ও ২০২২ সালেও ব্রাজিল প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ২০২৬ সালে তিনি আর একবার ফিরে এসে শেষ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু নরওয়ের কাছে হার সেই স্বপ্নও শেষ করে দিল।

ব্রাজিলের জন্য এই হার কত বড় ধাক্কা?

নেইমার শুধু একজন তারকা ফুটবলার নন, গত ১৬ বছর ধরে ব্রাজিল ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত মুখ ছিলেন। ব্রাজিলের আক্রমণভাগ, প্রচার, প্রত্যাশা এবং আবেগ—সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিলেন তিনি। তাই তাঁর জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত ব্রাজিলের জন্য বড় পরিবর্তনের বার্তা। এখন প্রশ্ন উঠবে, নেইমারের পর ব্রাজিলের নেতৃত্ব কে নেবেন? ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এন্ড্রিক, রদ্রিগোদের মতো নতুন প্রজন্ম আছে। কিন্তু নেইমারের মতো দীর্ঘদিন জাতীয় দলের ভার বহন করার অভিজ্ঞতা তাদের এখনও হয়নি।

নরওয়ের জয়ের গুরুত্ব

এই ম্যাচ শুধু নেইমারের আবেগঘন মুহূর্তের জন্য নয়, নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের জন্যও বড়। ব্রাজিলকে হারিয়ে নরওয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। হালান্ডের দুই গোল দেখিয়ে দিল, নরওয়ে আর শুধু চমক নয়; বড় মঞ্চে বড় দলকে হারানোর ক্ষমতাও তাদের আছে। Al Jazeera জানিয়েছে, এই জয়ের মাধ্যমে নরওয়ে প্রথম বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে এবং ব্রাজিল ১৯৯০ সালের পর সবচেয়ে আগের দিকের বিশ্বকাপ বিদায়ের ধাক্কা খেল।

এখন নজর কোথায়?

এখন নজর থাকবে নেইমার নিজে আরও কোনও বিস্তারিত বিবৃতি দেন কি না, ব্রাজিল ফুটবল কর্তৃপক্ষ কীভাবে তাঁর ভবিষ্যৎকে চিহ্নিত করে এবং জাতীয় দলের পুনর্গঠন কোন পথে এগোয়। কোচ কার্লো আনচেলোত্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে, কারণ ব্রাজিলের মতো দলের জন্য শেষ ষোলো থেকে বিদায় বড় ধাক্কা। সব মিলিয়ে, নরওয়ের কাছে হার ব্রাজিলের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ করল। আর সেই রাতেই নেইমারের চোখের জল যেন এক যুগের শেষের ছবি হয়ে রইল। বিশ্বকাপ জেতা হয়নি, কিন্তু ব্রাজিলের হয়ে তাঁর গোল, প্রতিভা এবং আবেগ ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে থেকে যাবে।

তথ্যসূত্র: Reuters, Al Jazeera, The Guardian ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।