আরজি কর মামলায় ভিসেরা নমুনা নিয়ে পরিবারের অভিযোগ, আদালতের দ্বারস্থ পরিবার
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসককে ঘিরে বহুল আলোচিত মামলায় এবার নতুন বিতর্ক সামনে এল। নির্যাতিতার পরিবারের দাবি, তাঁদের কাছে একটি বেনামী চিঠি পৌঁছেছে। সেই চিঠিতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা ভিসেরা নমুনা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, চিঠিতে দাবি করা হয়েছে যে ভিসেরা নমুনা কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগারে পাঠানোর আগে রাজ্য ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে বিকৃত করা হয়েছিল। তবে এই অভিযোগ এখনও আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে সরকারি ভাবে প্রমাণিত হয়নি। তাই বিষয়টিকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়ে শিয়ালদহ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন নির্যাতিতার বাবা-মা। তাঁদের বক্তব্য, চিঠিতে যেহেতু নির্দিষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে, তাই বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
কী দাবি করেছে পরিবার?
নির্যাতিতার পরিবারের দাবি, তাঁরা একই ধরনের দুটি চিঠি পেয়েছেন। প্রথম চিঠি মে মাসের মাঝামাঝি তাঁদের হাতে আসে। পরে আরও একটি চিঠি পৌঁছয় বলে দাবি পরিবারের। চিঠির প্রেরক নিজেকে বেলগাছিয়ার রাজ্য ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির প্রাক্তন কর্মী বলে পরিচয় দিয়েছেন বলে পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে।
চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা ভিসেরা নমুনা রাজ্য ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে বিকৃত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে কয়েকজন আধিকারিকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের। তবে আদালত বা তদন্তকারী সংস্থা যাচাই না করা পর্যন্ত এই অভিযোগকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে ধরা যায় না।
পরিবারের দাবি, প্রথম চিঠি পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তকারী সংস্থাকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, এরপরও দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ তাঁরা দেখতে পাননি। পরে দ্বিতীয় চিঠি আসায় তাঁরা আদালতের কাছে তদন্তের আবেদন জানান।
কেন ভিসেরা নমুনা গুরুত্বপূর্ণ?
কোনও মৃত্যুর তদন্তে ভিসেরা নমুনা গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ হতে পারে। মৃত্যুর কারণ, বিষক্রিয়া, রাসায়নিক উপাদান বা শরীরের অভ্যন্তরীণ অবস্থার কিছু দিক বুঝতে এই ধরনের পরীক্ষার ভূমিকা থাকে।
সেই কারণে ভিসেরা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সিলমোহর, ল্যাবরেটরিতে পাঠানো এবং পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ নিয়ম মেনে হওয়া জরুরি। এই প্রক্রিয়ার কোনও অংশ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি করতে পারে। তবে সন্দেহ বা অভিযোগ তৈরি হওয়া আর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
এই কারণেই পরিবার চাইছে, চিঠিটি আসল কি না, প্রেরক সত্যিই ফরেনসিক ল্যাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না এবং নমুনা সংরক্ষণ বা পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় কোনও অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হোক।
আদালতের দিকে নজর
আরজি কর মামলা দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্য রাজনীতি, প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থার আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তদন্তের প্রতিটি ধাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের নজর রয়েছে। সেই অবস্থায় ফরেনসিক নমুনা নিয়ে নতুন অভিযোগ সামনে আসায় মামলাটি ঘিরে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে।
আইনজীবীদের একাংশের মতে, আদালত যদি মনে করে অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, তাহলে সংশ্লিষ্ট নথি, ল্যাবরেটরি প্রক্রিয়া, নমুনা সংরক্ষণের রেকর্ড এবং চিঠির উৎস পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। তবে আদালতের নির্দেশের আগে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
এই ধরনের সংবেদনশীল মামলায় সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও সতর্ক ভাষা জরুরি। বেনামী চিঠির দাবি এবং প্রমাণিত তথ্য—দুটি বিষয় আলাদা। তাই এই ঘটনাকে “ভিসেরা বিকৃতি প্রমাণিত” হিসেবে নয়, বরং “ভিসেরা নমুনা বিকৃত করার অভিযোগ” হিসেবে দেখা উচিত।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিরপেক্ষ যাচাই। অভিযোগ সত্যি হলে তা তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলতে পারে। আবার অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার, যাতে বিভ্রান্তি না ছড়ায়। এখন নজর থাকবে আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং তদন্তকারী সংস্থার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
