হরমুজে ইরানে ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলা, বাতিল তেল বিক্রির অনুমতি
ওয়াশিংটন/তেহরান: হরমুজ প্রণালীতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭ জুলাই এই অভিযান চালানো হয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের দাবি, অভিযানে ইরানের ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, কমান্ড নেটওয়ার্ক এবং ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত স্থাপনা ছিল বলে জানানো হয়েছে।
সেন্টকম আরও দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালী ও তার আশপাশে আইআরজিসি-র ৬০টির বেশি ছোট নৌযানকেও লক্ষ্য করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য, হরমুজ দিয়ে চলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এক নজরে
- হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলার অভিযোগের পর ইরানে মার্কিন অভিযান
- সেন্টকমের দাবি, ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে
- আইআরজিসি-র ৬০টির বেশি ছোট নৌযানকে লক্ষ্য করার দাবি
- দক্ষিণ ইরানে বিস্ফোরণ ও আহতের খবর দিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম
- ইরানের তেল বিক্রির বিশেষ ছাড় বাতিল করেছে ওয়াশিংটন
কেন নতুন করে হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র?
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। তাই এই এলাকায় জাহাজে হামলার খবর সামনে এলে তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার পর ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমানো জরুরি ছিল। সেই কারণেই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার সাইট এবং কমান্ড নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে এই অভিযানে ঠিক কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা যায়নি। তাই বিষয়টি আপাতত মার্কিন দাবির ভিত্তিতেই উল্লেখ করা হচ্ছে।
কোথায় কোথায় বিস্ফোরণের খবর?
ইরান সরকার প্রথমে হামলা নিয়ে বিস্তারিত সরকারি বিবৃতি দেয়নি। তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দক্ষিণ ইরানের কয়েকটি এলাকায় বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। বন্দর আব্বাস, সিরিক এবং কেশম দ্বীপ এলাকায় বিস্ফোরণের খবর সামনে এসেছে। সিরিক এলাকায় একটি বাণিজ্যিক ঘাটে শার্পনেলের আঘাতে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে হতাহতের সংখ্যা বা সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব এখনও স্পষ্ট নয়।
তেল বিক্রির ছাড় বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র
সামরিক অভিযানের পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বিক্রির জন্য দেওয়া ৬০ দিনের বিশেষ ছাড় বাতিল করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছাড়ের ফলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল বিক্রির সুযোগ ছিল। কিন্তু হরমুজের ঘটনার পর সেই অনুমতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। তেহরানের দাবি, এটি চুক্তির লঙ্ঘন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবিশ্বস্ততার প্রমাণ।
কাতার ও সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া
হরমুজ এলাকায় জাহাজে হামলার ঘটনায় কাতার ও সৌদি আরবও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কাতারের একটি এলএনজি ট্যাঙ্কার এবং সৌদি পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজ হামলার মুখে পড়েছিল। কাতার এই ঘটনায় ইরানকে দায়ী করেছে। সৌদি আরবও জাহাজে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তবে তেহরান এই অভিযোগ সরাসরি স্বীকার করেনি। তাই এই অংশে “দাবি” এবং “অভিযোগ” শব্দ ব্যবহার করা জরুরি।
শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা
এই উত্তেজনা এমন সময়ে তৈরি হল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তী সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছিল। হরমুজে জাহাজে হামলা এবং তার পাল্টা মার্কিন অভিযানের পর সেই প্রক্রিয়া নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সামরিক উত্তেজনা বাড়লে স্থায়ী শান্তি চুক্তির পথ আরও কঠিন হতে পারে। ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপও এখন আন্তর্জাতিক নজরে থাকবে।
কেন হরমুজ প্রণালী এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালী উপসাগরীয় তেল ও গ্যাস পরিবহণের প্রধান পথ। এই জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলে জাহাজ চলাচল, বীমা খরচ এবং জ্বালানির দামে প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্ব বাজারে তেলের দাম অনেক সময় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তাই হরমুজে উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া ও ইউরোপের বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে।
শেষ কথা
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলার অভিযোগের পর ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেন্টকম ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের দাবি করেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই এখনও সামনে আসেনি। এখন নজর থাকবে ইরানের প্রতিক্রিয়া, তেল বাজারের অবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ভবিষ্যতের দিকে।
তথ্যসূত্র: Reuters, CENTCOM ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন
