রাজনীতি

দুর্নীতির প্রমাণ মিললে উপাচার্যদেরও জেলে যেতে হতে পারে, ইঙ্গিত উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর

কলকাতা: রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কড়া বার্তা দিলেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্য, শিক্ষা প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। অতীতের কোনও অনিয়মের প্রমাণ সামনে এলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

তবে মন্ত্রী কোনও বর্তমান বা প্রাক্তন উপাচার্যের নাম উল্লেখ করেননি। কারও বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দায়ের, তদন্ত শুরু অথবা গ্রেফতারির প্রস্তুতি চলছে—এমন তথ্যও তাঁর বক্তব্যে নেই। ফলে একাধিক উপাচার্য শীঘ্রই জেলে যাচ্ছেন বলে ধরে নেওয়ার কোনও ভিত্তি এই মুহূর্তে নেই।

রাজ্য সরকারের সরকারি পোর্টালেও জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়কে উচ্চশিক্ষা দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

উপাচার্যদের নিয়ে কী বলেছেন জগন্নাথ?

সাক্ষাৎকারে জগন্নাথ দাবি করেন, গত কয়েক দশকে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব বেড়েছে। বিশেষ করে আগের সরকারের সময়ে মেধার বদলে প্রভাব ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর কারাবাসের প্রসঙ্গ তুলে জগন্নাথ বলেন, ভবিষ্যতে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বা দু’জন উপাচার্যকে সংশোধনাগারে যেতে দেখলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তাঁর এই মন্তব্যের পরই উচ্চশিক্ষা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কিন্তু কারও কারাবাসের সিদ্ধান্ত প্রশাসন বা কোনও মন্ত্রী নিতে পারেন না। নির্দিষ্ট অভিযোগ, তদন্তে পাওয়া প্রমাণ এবং আদালতের নির্দেশের পরেই সেই প্রশ্ন আসে। এই কারণে জগন্নাথের মন্তব্যকে এখন প্রশাসনিক সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা উচিত, আসন্ন গ্রেফতারির ঘোষণা হিসেবে নয়।

আগেও গ্রেফতার হয়েছিলেন এক উপাচার্য

মন্ত্রীর বক্তব্যের একটি অংশ নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন উঠছে। তিনি বলেছেন, প্রাক্তন শিক্ষমন্ত্রীর জেলে যাওয়া দেখা গেলেও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের জেলে যাওয়া দেখা যায়নি। কিন্তু অতীতের ঘটনা অন্য কথা বলছে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষক নিয়োগ মামলায় উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্যকে গ্রেফতার করেছিল সিবিআই। তিনি সেই সময় স্কুল সার্ভিস কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যানও ছিলেন। তদন্তকারী সংস্থা তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এনেছিল। তবে যে কোনও মামলার মতোই অভিযোগ ও আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।

ফলে পশ্চিমবঙ্গে কোনও উপাচার্য আগে কখনও গ্রেফতার হননি—এমন বক্তব্য তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন কোনও উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কোন প্রতিষ্ঠানগুলির হিসাব পরীক্ষা হবে?

উচ্চশিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি ফার্মেসি, বিএড, আইটিআই এবং পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, গত ১৫ বছরে বেসরকারিকরণের সুযোগ নিয়ে কিছু জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বদলে কার্যত শংসাপত্র দেওয়ার ব্যবসা গড়ে উঠেছিল।

এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, পরিকাঠামো, শিক্ষক সংখ্যা এবং শিক্ষার মান পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। নতুন কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়ার আগে পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলির বিস্তারিত হিসাব পরীক্ষা ও সরেজমিনে পরিদর্শনের কথাও সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।

তবে কোন প্রতিষ্ঠান প্রথমে পরীক্ষার আওতায় আসবে, পর্যালোচনা কবে শুরু হবে এবং কোন দফতর বা সংস্থা তা পরিচালনা করবে—সেই বিষয়ে সাক্ষাৎকারে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। সরকারি নির্দেশিকা সামনে এলে অডিটের পরিধি পরিষ্কার হবে।

এর আগে রাজ্যের সরকারি ও সরকারপোষিত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অডিট প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার খবরও সামনে এসেছিল। তবে সেই নির্দেশ এবং বেসরকারি কারিগরি ও শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নিয়ে মন্ত্রীর বর্তমান বক্তব্য এক বিষয় নয়।

শিক্ষক ও গবেষক নিয়োগে নতুন নীতির কথা

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক এবং গবেষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও বদলের ইঙ্গিত দিয়েছেন জগন্নাথ। তাঁর দাবি, পরিচিতি বা রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে নিয়োগের সুযোগ থাকবে না। যোগ্যতা ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্বাচন করার জন্য সরকার একটি নতুন নীতির কাঠামো তৈরি করছে।

মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, উচ্চশিক্ষার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিকে রাখা হবে না। যদিও প্রস্তাবিত নীতির খসড়া, নির্বাচন কমিটির গঠন বা তা কার্যকর হওয়ার সময় এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তাই এটিকে এখন সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য বলা যায়; কার্যকর নিয়োগবিধি নয়।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন এখনই নয়

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়েও সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয় উচ্চশিক্ষামন্ত্রীকে। তাঁর বক্তব্য, প্রথমে সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ছাত্রছাত্রীদের কাছে আবার আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী ফিরলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হবে।

তবে ভোটের কোনও সম্ভাব্য সময় বা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তিনি জানাননি। ফলে রাজ্যের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শীঘ্রই ছাত্রভোট হচ্ছে—এমন কোনও ঘোষণা এখনও নেই।

এখন কোন তথ্যের অপেক্ষা?

উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে বড় পর্যালোচনার ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু কোনও উপাচার্যের বিরুদ্ধে নতুন মামলা বা তদন্তের লিখিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

এখন নজর থাকবে তিনটি বিষয়ে—সরকার কাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে, কোন প্রতিষ্ঠানগুলি হিসাব পরীক্ষার আওতায় আসে এবং শিক্ষক নিয়োগের নতুন নীতি কবে প্রকাশিত হয়। তার আগে “একাধিক উপাচার্য জেলে যাচ্ছেন” বলে নিশ্চিতভাবে লেখা তথ্যনির্ভর হবে না।

Avatar photo

Bapan Biswas

বাপন বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। তিনি সাইটের সম্পাদকীয় পরিকল্পনা, তথ্য যাচাই এবং সংবাদ প্রকাশনার দায়িত্বে রয়েছেন। দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা ও বিনোদনের খবর সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে সহজ বাংলায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।