আন্তর্জাতিক

তিক্ততার মাঝেই ভরসা! ঢাকায় ভারতের ভিসা কেন্দ্রে কেন রেকর্ড ভিড়?

ঢাকা: প্রায় দুই বছরের অপেক্ষার পর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ফের ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন নেওয়া শুরু করেছে ভারত। পরিষেবা চালু হওয়ার পর থেকেই ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে আবেদনকারীদের ভিড় দেখা গিয়েছে। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, পরিষেবা পুনরায় শুরু হওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে।

রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও চিকিৎসা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা, কেনাকাটা, ব্যবসা এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কারণে ভারত এখনও বহু বাংলাদেশির গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। বিশেষ করে কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু এবং মুম্বই দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছে চিকিৎসা ও ভ্রমণের পরিচিত কেন্দ্র।

এক নজরে:
• বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ফের ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন শুরু
• প্রথম ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজারের বেশি আবেদন জমার দাবি
• ঢাকাসহ পাঁচটি ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে ভিড়
• চিকিৎসা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা এবং কেনাকাটার চাহিদা বড় কারণ
• দুই দেশের মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন পর্যবেক্ষকরা

কেন এত ভিড়?

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়, সামাজিক ও পারিবারিক দিক থেকেও গভীর। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। সীমান্তবর্তী বহু পরিবারের আত্মীয়-স্বজন দুই দেশেই থাকেন। সেই কারণে ভ্রমণ, চিকিৎসা, ব্যবসা এবং পারিবারিক কারণে ভারত যাওয়া বহু বাংলাদেশির কাছে নিয়মিত প্রয়োজনের অংশ।

বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছে কলকাতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দূরত্ব কম, ভাষা ও খাবারের মিল আছে, চিকিৎসা খরচ তুলনামূলক সাশ্রয়ী—এই সব কারণেই কলকাতা বহু বাংলাদেশির প্রথম পছন্দের শহর। একইভাবে উন্নত চিকিৎসার জন্য চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, দিল্লি ও মুম্বইয়েও বাংলাদেশের রোগী ও তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে যান।


আরো পড়ুন: ভারত -পাক সম্পর্কে ফের ট্র্যাক-২ আলোচনা ঘিরে জল্পনা, সরকারি যোগ অস্বীকার নয়াদিল্লির

কেন বন্ধ ছিল ট্যুরিস্ট ভিসা?

বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের পর ভারতীয় ভিসা পরিষেবা সীমিত করা হয়েছিল। ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলেও জরুরি চিকিৎসা, ব্যবসা বা নির্দিষ্ট প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে কিছু ভিসা পরিষেবা চালু ছিল।

স্বাভাবিক ভিসা পরিষেবা সীমিত হওয়ায় গত কয়েক বছরে দুই দেশের মানুষের যাতায়াতে বড় প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে যাঁরা চিকিৎসা, পারিবারিক দেখা-সাক্ষাৎ বা স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণের জন্য ভারতে যেতে চাইছিলেন, তাঁদের অনেকেই দীর্ঘ অপেক্ষার মুখে পড়েন।

চিকিৎসাই বড় কারণ

পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্যুরিস্ট ভিসার চাহিদা বাড়ার অন্যতম বড় কারণ চিকিৎসা। বাংলাদেশের অনেক রোগী দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালের উপর নির্ভর করেন। চিকিৎসার খরচ, ভাষাগত সুবিধা, পরিচিত পরিবেশ এবং যাতায়াতের তুলনামূলক সহজতার কারণে ভারত তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।

ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ থাকায় অনেক রোগী ও তাঁদের পরিবারকে বিকল্প হিসেবে অন্য দেশে যাওয়ার কথা ভাবতে হয়েছিল। কিন্তু থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর বা অন্য দেশের চিকিৎসা ও যাতায়াত খরচ অনেকের নাগালের বাইরে। ফলে ভারতীয় ভিসা পুনরায় চালু হওয়াকে অনেকেই স্বস্তির খবর হিসেবে দেখছেন।

পরিসংখ্যানে কতটা প্রভাব পড়েছিল?

রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ২১ লক্ষ বাংলাদেশি ভারতে এসেছিলেন। কিন্তু স্বাভাবিক ভিসা পরিষেবা সীমিত হওয়ার পর ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ৪ লক্ষ ৭০ হাজারে। অর্থাৎ রাজনৈতিক ও ভিসা-সংক্রান্ত অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল দুই দেশের যাতায়াত ও পর্যটন ক্ষেত্রে।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াত শুধু পর্যটনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা, পারিবারিক যোগাযোগ এবং সীমান্তবর্তী অর্থনীতির সম্পর্কও রয়েছে।

কলকাতার অর্থনীতিতেও প্রভাব

বাংলাদেশি পর্যটক ও রোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় কলকাতার কয়েকটি ব্যবসা খাতে প্রভাব পড়েছিল। নিউ মার্কেট, মার্কুইস স্ট্রিট, পার্ক সার্কাস, সল্টলেক ও হাসপাতালসংলগ্ন এলাকার হোটেল, গেস্ট হাউস, ট্রাভেল এজেন্সি, রেস্তোরাঁ এবং ছোট দোকানগুলিতে বাংলাদেশি গ্রাহকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল।

ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালু হওয়ায় এই ব্যবসাগুলিতে কিছুটা গতি ফিরতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে চিকিৎসা-নির্ভর ভ্রমণ, স্বল্পমেয়াদি থাকা, কেনাকাটা এবং স্থানীয় পরিবহণ পরিষেবায় নতুন করে চাহিদা তৈরি হতে পারে।

কূটনৈতিক সম্পর্কের মাঝেও মানুষের যোগাযোগ

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ইস্যুতে চাপের মুখে পড়েছে। সীমান্ত, অনুপ্রবেশ, রাজনৈতিক অবস্থান, জলবণ্টন এবং নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন অনেক সময় কূটনৈতিক টানাপোড়েনের বাইরে গিয়ে বাস্তব সম্পর্কের ছবিটা তুলে ধরে।

ভিসা আবেদন কেন্দ্রে ভিড় সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়। চিকিৎসা, আত্মীয়তা, ব্যবসা, শিক্ষা এবং পর্যটন—এই সব ক্ষেত্র দুই দেশের মানুষের যোগাযোগকে এখনও গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে।

সামনে কী হতে পারে?

ভিসা আবেদন পুনরায় শুরু হলেও আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রথমদিকে চাপ থাকতে পারে। তাই আবেদনকারীদের নথি ঠিকভাবে প্রস্তুত রাখা, নির্ধারিত নিয়ম মেনে আবেদন করা এবং ভিসা কেন্দ্রের নির্দেশিকা অনুসরণ করা জরুরি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ভিসা পরিষেবা ধাপে ধাপে আরও স্বাভাবিক হলে দুই দেশের মানুষের যাতায়াত বাড়বে। এতে চিকিৎসা পর্যটন, ব্যবসা, শিক্ষা এবং সীমান্ত-নির্ভর অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

শেষ কথা

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালু হওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি দুই দেশের মানুষে-মানুষে যোগাযোগ ফের স্বাভাবিক করার দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামা থাকলেও বাস্তব প্রয়োজনের জায়গায় ভারত এখনও বহু বাংলাদেশির কাছে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। আগামী দিনে ভিসা পরিষেবা কত দ্রুত ও কতটা মসৃণভাবে এগোয়, তার উপর নির্ভর করবে দুই দেশের যাতায়াত ও পর্যটন খাতের পরবর্তী গতি।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।