রাজ্য

অন্নপূর্ণা যোজনার প্রথম কিস্তি পেলেন ১.১ কোটি মহিলা, ২৬ লক্ষ আবেদন বাতিল কেন?

পশ্চিমবঙ্গে অন্নপূর্ণা যোজনার প্রথম কিস্তি পাঠানো শুরু করল রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১.১ কোটি মহিলা উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রথম দফার আর্থিক সহায়তা সরাসরি পাঠানো হয়েছে। মহিলাদের আর্থিক সুরক্ষা এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচে সহায়তা করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

তবে প্রকল্পের টাকা পাঠানোর পাশাপাশি ২৬ লক্ষ আবেদন বাতিলের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজ্য সরকারের বক্তব্য, নাগরিকত্ব এবং পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ী বসবাসের তথ্য যাচাইয়ের সময় সন্দেহ তৈরি হওয়ায় ওই আবেদনগুলি অনুমোদন করা হয়নি। সরকারের দাবি, করদাতাদের অর্থ যাতে শুধুমাত্র যোগ্য উপভোক্তাদের কাছেই পৌঁছয়, সেই কারণেই যাচাই প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এক নজরে:
• অন্নপূর্ণা যোজনার প্রথম কিস্তি পাঠানো শুরু
• প্রায় ১.১ কোটি মহিলা উপভোক্তা প্রথম দফার টাকা পেয়েছেন
• মোট প্রায় ১.৬ কোটি আবেদন জমা পড়েছিল
• নাগরিকত্ব ও স্থায়ী বসবাস যাচাইয়ে সন্দেহ থাকায় ২৬ লক্ষ আবেদন বাতিল
• যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা DBT দেওয়ার পরিকল্পনা
• আবেদনকারীদের status ও bank details যাচাই করা জরুরি

কী এই অন্নপূর্ণা যোজনা?

অন্নপূর্ণা যোজনা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মহিলা-কেন্দ্রিক আর্থিক সহায়তা প্রকল্প। এই প্রকল্পে যোগ্য মহিলা উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠানো হয়। Direct Benefit Transfer বা DBT পদ্ধতিতে টাকা পাঠানো হওয়ায় মধ্যবর্তী স্তর কমে এবং উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ পৌঁছয়।

সরকারের বক্তব্য, এই প্রকল্প মহিলাদের হাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়ার একটি বড় পদক্ষেপ। দৈনন্দিন সংসার খরচ, ব্যক্তিগত প্রয়োজন, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা বা পরিবারের ছোটখাটো আর্থিক চাপ সামলাতে এই টাকা সহায়ক হতে পারে।

আরো পড়ুন: ডিজেল সংগ্রহে স্বস্তি, জরুরি পরিষেবা ও কৃষিক্ষেত্রে বড় ছাড়

কতজন টাকা পেলেন?

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় প্রায় ১.১ কোটি মহিলা উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়েছে। এত বড় সংখ্যায় DBT পাঠানো প্রশাসনিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ beneficiary list, bank account, Aadhaar linkage, পরিচয়পত্র এবং বাসস্থানের তথ্য যাচাই করার পরই টাকা পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে।

প্রশাসনিক মহলের মতে, বড় সামাজিক প্রকল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সঠিক উপভোক্তা চিহ্নিত করা। ভুল তালিকা তৈরি হলে একদিকে প্রকৃত উপভোক্তা বঞ্চিত হতে পারেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থ অযোগ্য ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

২৬ লক্ষ আবেদন বাতিল কেন?

রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য মোট প্রায় ১.৬ কোটি আবেদন জমা পড়েছিল। তার মধ্যে ২৬ লক্ষ আবেদন বাতিল করা হয়েছে। সরকারের দাবি, নাগরিকত্ব এবং domicile status বা স্থায়ী বসবাসের তথ্য নিয়ে সন্দেহ থাকায় ওই আবেদনগুলি অনুমোদন করা হয়নি।

এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হতে পারে। কারণ এত বড় সংখ্যায় আবেদন বাতিল হলে অনেক আবেদনকারীই জানতে চাইবেন, তাঁদের নাম কেন তালিকায় নেই। তাই আবেদন বাতিলের কারণ স্পষ্ট করা, ভুল থাকলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং স্থানীয় স্তরে সহায়তা কেন্দ্র সক্রিয় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

অন্নপূর্ণা যোজনার প্রথম কিস্তি পেলেন পশ্চিমবঙ্গের মহিলা উপভোক্তারা



সরকারের যুক্তি কী?

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, সরকারি কোষাগারের টাকা করদাতাদের অর্থ। তাই সেই অর্থ কার কাছে যাচ্ছে, তা যাচাই করা সরকারের দায়িত্ব। তাঁর দাবি, প্রকল্পের সুবিধা প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক এবং পশ্চিমবঙ্গের যোগ্য মহিলা বাসিন্দাদের কাছেই পৌঁছতে হবে।

সরকারের এই অবস্থানের মূল বার্তা হল—সামাজিক প্রকল্প চলবে, কিন্তু উপভোক্তা তালিকা যাচাই ছাড়া টাকা দেওয়া হবে না। তবে এই যাচাই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, দ্রুত এবং ভুল সংশোধনের সুযোগসহ হওয়া দরকার বলে মনে করছেন প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

আবেদনকারীরা কীভাবে status দেখবেন?

যাঁরা অন্নপূর্ণা যোজনায় আবেদন করেছেন, তাঁদের নিজেদের আবেদন status যাচাই করা জরুরি। আবেদন approved হয়েছে কি না, bank account সঠিক আছে কি না, Aadhaar-linked account সক্রিয় কি না এবং DBT জমা হয়েছে কি না—এই তথ্যগুলি নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।

সাধারণত সরকারি পোর্টাল, স্থানীয় প্রশাসনিক অফিস, দুয়ারে সরকার ধরনের সহায়তা কেন্দ্র বা সংশ্লিষ্ট ব্লক/মিউনিসিপ্যাল অফিসের মাধ্যমে আবেদন status জানা যেতে পারে। আবেদনকারীর Aadhaar number, registered mobile number, application number, district বা block details লাগতে পারে।

নাম না থাকলে কী করবেন?

কোনও আবেদনকারীর নাম beneficiary list-এ না থাকলে প্রথমে আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা দরকার। বানান ভুল, bank account mismatch, Aadhaar-bank linkage না থাকা, ঠিকানার প্রমাণে সমস্যা বা mobile number mismatch-এর মতো কারণে অনেক সময় DBT আটকে যেতে পারে।

আবেদন বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরে গিয়ে কারণ জানতে হবে। প্রয়োজনীয় নথি ঠিক থাকলে সংশোধন বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে কি না, সেটিও স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত। তবে কোনও unofficial agent বা middleman-এর কাছে টাকা দিয়ে কাজ করানোর চেষ্টা করা বিপজ্জনক হতে পারে।

DBT ব্যবস্থায় কী কী সতর্কতা জরুরি?

DBT প্রকল্পে টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যায়। তাই উপভোক্তার নিজের নামে সক্রিয় bank account থাকা দরকার। Aadhaar linkage, mobile number update এবং account KYC ঠিক না থাকলে টাকা জমা হতে দেরি হতে পারে।

আবেদনকারীদের আরও একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। প্রকল্পের status check বা টাকা পাইয়ে দেওয়ার নামে কোনও অচেনা ব্যক্তি OTP, bank PIN, Aadhaar copy বা payment চাইলে তা প্রতারণা হতে পারে। সরকারি প্রকল্পের টাকা পাওয়ার জন্য সাধারণত ব্যক্তিগত OTP বা bank password কাউকে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পরে নতুন প্রকল্প

অন্নপূর্ণা যোজনা চালুর পর রাজ্যের মহিলা-কেন্দ্রিক আর্থিক সহায়তা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের জায়গায় নতুন প্রকল্প হিসেবে অন্নপূর্ণা যোজনাকে সামনে এনেছে বর্তমান সরকার।

সরকারের দাবি, নতুন প্রকল্পে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে এবং উপভোক্তা তালিকা আরও যাচাই-নির্ভর করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে সময়মতো DBT, ভুল আবেদন নিষ্পত্তি, স্বচ্ছ beneficiary list এবং গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সহজ grievance system-এর উপর।

রাজনৈতিক মহলে কী প্রতিক্রিয়া?

১.১ কোটি মহিলার অ্যাকাউন্টে প্রথম কিস্তি পাঠানোকে রাজ্য সরকার বড় প্রশাসনিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। সরকারের দাবি, এই প্রকল্প মহিলাদের আর্থিক স্বাধীনতা এবং পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় সহায়ক হবে।

অন্যদিকে ২৬ লক্ষ আবেদন বাতিলের বিষয়টি বিরোধীদের হাতে রাজনৈতিক প্রশ্নের সুযোগ করে দিতে পারে। আবেদন বাতিলের মানদণ্ড কতটা স্বচ্ছ, ভুলবশত কেউ বাদ পড়েছেন কি না এবং সংশোধনের ব্যবস্থা কত দ্রুত হবে—এই প্রশ্নগুলি আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শেষ কথা

অন্নপূর্ণা যোজনার প্রথম কিস্তি পাঠানো পশ্চিমবঙ্গের মহিলা উপভোক্তাদের জন্য একটি বড় সামাজিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ। প্রায় ১.১ কোটি মহিলার অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ পাঠানো এই প্রকল্পের ব্যাপকতা দেখায়।

তবে বড় প্রকল্পের সাফল্য শুধু টাকা পাঠানোর সংখ্যায় মাপা যায় না। প্রকৃত উপভোক্তা নির্বাচন, ভুল সংশোধন, আবেদনকারীদের সহায়তা, DBT স্বচ্ছতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি—এই সব ক্ষেত্রেও প্রশাসনের কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনে এই প্রকল্প কতটা নিয়মিত, স্বচ্ছ এবং উপভোক্তা-বান্ধবভাবে এগোয়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজ্যের মানুষ ও রাজনৈতিক মহলের।

Avatar photo

Bapan Biswas

বাপন বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। তিনি সাইটের সম্পাদকীয় পরিকল্পনা, তথ্য যাচাই এবং সংবাদ প্রকাশনার দায়িত্বে রয়েছেন। দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা ও বিনোদনের খবর সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে সহজ বাংলায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।