বিশ্বকাপে ৬৪ দল হলে কি ভারতের সুযোগ বাড়বে? মুখ খুললেন ফিফা সভাপতি
নয়াদিল্লি, ১৩ জুলাই: ৩২ থেকে ৪৮—বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা বাড়ানোর পর এ বার ৬৪ দলের প্রতিযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে পারে ফিফা। চলতি বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট কমিটিতে প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তবে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের কোনও সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। ২০৩০ সাল থেকেই নতুন ব্যবস্থা চালু হবে—এমন কথাও জানায়নি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা।
দলসংখ্যা বাড়লে এশিয়া থেকে বিশ্বকাপে যাওয়ার সুযোগও বাড়তে পারে। সেই হিসেবে ভারতের সামনে নতুন দরজা খুলবে। কিন্তু শুধু বিশ্বকাপে জায়গা বাড়লেই ভারত যোগ্যতা অর্জন করবে না। মাঠের ফল, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী দল গড়ার কাজটাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এক নজরে
- ২০২৬ বিশ্বকাপের পরে ৬৪ দলের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে
- এখনও ফিফার কোনও অনুমোদন মেলেনি
- ২০৩০ বিশ্বকাপ ৬৪ দল নিয়ে হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়
- এশিয়ার কোটা বাড়লে ভারতের সুযোগ বাড়তে পারে
- জায়গা বাড়লেও যোগ্যতা অর্জনের জন্য মাঠে ধারাবাহিক সাফল্য প্রয়োজন
৬৪ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে কী বলেছেন ইনফান্তিনো?
সুইস সম্প্রচারমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইনফান্তিনো জানান, ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ৬৪ দলের প্রস্তাবটি ফিফার সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলিতে আলোচনা করা হবে। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বকাপকে শুধু ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্বের সব প্রান্তের দেশকে স্বপ্ন দেখার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
২০২৬ সালে প্রথমবার ৪৮টি দল নিয়ে বিশ্বকাপ হচ্ছে। ইনফান্তিনোর মতে, নতুন ব্যবস্থায় তুলনামূলক ছোট ফুটবল দেশগুলিও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পেরেছে। বিভিন্ন মহাদেশের দল গোল করেছে এবং পয়েন্ট পেয়েছে। আফ্রিকার দশটি দলের মধ্যে নয়টি নকআউট পর্বে ওঠার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
ফিফা সভাপতির যুক্তি, বিশ্বকাপে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ থাকলে ছোট দেশগুলিও ফুটবলের পরিকাঠামো, প্রশিক্ষণ এবং খেলোয়াড় তৈরিতে বেশি বিনিয়োগ করতে উৎসাহ পায়। তবে তিনি কোথাও বলেননি যে ৬৪ দলের প্রস্তাব ইতিমধ্যেই গৃহীত হয়েছে। আপাতত বিষয়টি আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
২০৩০ বিশ্বকাপেই কি ৬৪ দল খেলবে?
এখনই তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। ২০৩০ বিশ্বকাপের মূল আয়োজক মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেন। বিশ্বকাপের শতবর্ষ উপলক্ষে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতেও একটি করে বিশেষ ম্যাচ আয়োজন করা হবে। এই ছয় দেশ আয়োজক হিসেবে সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করবে।
ফিফা এখনও ২০৩০ সালের জন্য ৬৪ দল, নতুন বাছাই ব্যবস্থা বা মহাদেশভিত্তিক কোটা ঘোষণা করেনি। ফলে আয়োজক দেশ চূড়ান্ত হয়ে গেলেও প্রতিযোগিতার দলসংখ্যা বদলানোর বিষয়ে আলাদা সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে।
৬৪ দল হলে সবচেয়ে সহজ সম্ভাব্য কাঠামো হতে পারে চারটি করে দল নিয়ে ১৬টি গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপের প্রথম দুই দল শেষ ৩২-এ উঠতে পারে। কিন্তু এটি এখনও অনুমানভিত্তিক একটি সম্ভাব্য ছক; ফিফার অনুমোদিত নিয়ম নয়। দল ও ম্যাচ বাড়লে প্রতিযোগিতার সময়, ভ্রমণ, মাঠ এবং আয়োজক শহরের উপরও বাড়তি চাপ পড়বে।
এশিয়ার কোটা কতটা বাড়তে পারে?
২০২৬ বিশ্বকাপে এশিয়ার জন্য আটটি সরাসরি জায়গা রয়েছে। আরও একটি দেশ আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফের মাধ্যমে বিশ্বকাপে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। প্রচলিত ভাষায় একে ‘৮.৫টি জায়গা’ বলা হলেও সরকারি হিসাবে এটি আটটি সরাসরি স্থান এবং একটি প্লে-অফের সুযোগ।
৬৪ দলের বিশ্বকাপ হলে অতিরিক্ত ১৬টি জায়গা বিভিন্ন মহাদেশের মধ্যে ভাগ করা হবে। সেই ভাগে এশিয়া কতটি স্থান পাবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। কেউ কেউ বর্তমান অনুপাত ধরে নতুন সংখ্যার হিসাব করছেন, কিন্তু ফিফা কোনও নতুন কোটা প্রকাশ করেনি।
এশিয়ার জন্য আরও দুই বা তিনটি সুযোগ বাড়লেও তার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বর্তমানে বাছাইপর্বের শেষ দিকে পৌঁছেও বিশ্বকাপে যেতে না পারা কয়েকটি দেশ তখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বাড়তি সুযোগ পাবে।
ভারতের সুযোগ কি সত্যিই বাড়বে?
গাণিতিক হিসাবে অবশ্যই বাড়বে। বিশ্বকাপে বেশি দল মানে বাছাইপর্বে আরও বেশি যোগ্যতার জায়গা। কিন্তু ভারতের বর্তমান অবস্থান বিবেচনা করলে পথ এখনও কঠিন।
৪৮ দলের ২০২৬ বিশ্বকাপে এশিয়ার জন্য আগের তুলনায় বেশি জায়গা থাকলেও ভারত বাছাইপর্বের তৃতীয় ধাপে পৌঁছতে পারেনি। ভারত বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনের দৌড় থেকে আগেই ছিটকে যায়।
এই ফলই দেখায়, কোটা বৃদ্ধি এবং যোগ্যতা অর্জন এক বিষয় নয়। ভারতকে আগে বাছাইপর্বের প্রথম দিকের বাধাগুলি নিয়মিত পেরোতে হবে। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে ২-১ গোলে হার-সহ ২০২৬ সালের বাছাইপর্বে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পয়েন্ট হারিয়েছিল ভারত।
ভারতের কোন জায়গাগুলিতে উন্নতি দরকার?
ভারতীয় দলের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ধারাবাহিকতা। একটি বড় ম্যাচে ভালো খেলার পর পরের ম্যাচে ছন্দ হারালে দীর্ঘ বাছাইপর্বে টিকে থাকা কঠিন।
ঘরোয়া প্রতিযোগিতার মান বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়মিত ম্যাচের সুযোগ দিতে হবে। বয়সভিত্তিক দল থেকে জাতীয় দলে ওঠার পথও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। শুধু শিবির আয়োজন নয়, দীর্ঘ সময় ধরে একই পরিকল্পনায় কাজ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের মানও গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতা না থাকলে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের চাপ সামলানো কঠিন হয়। একই সঙ্গে স্থায়ী প্রশিক্ষক, পরিষ্কার খেলার কৌশল এবং খেলোয়াড় নির্বাচনে ধারাবাহিকতা দরকার।
সুযোগ বাড়বে, কিন্তু জায়গা জিততে হবে মাঠেই
৬৪ দলের বিশ্বকাপ ভারতের জন্য আশার খবর হতে পারে। এশিয়ার কোটা বাড়লে বাছাইপর্বে ভারতের মতো দেশগুলির সামনে আগের তুলনায় বড় সুযোগ থাকবে।
তবে তার আগে ফিফাকে প্রস্তাবটি অনুমোদন করতে হবে। এরপর ঠিক হবে মহাদেশভিত্তিক কোটা এবং বাছাইপর্বের নিয়ম। সবশেষে ভারতকে মাঠের ফলের ভিত্তিতেই নিজের জায়গা অর্জন করতে হবে।
বিশ্বকাপের দরজা আরও বড় হতে পারে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে ঢোকার মতো দল তৈরি করার দায়িত্ব ভারতীয় ফুটবলেরই।
তথ্যসূত্র: ফিফার সরকারি তথ্য, ফিফা সভাপতির সাক্ষাৎকার এবং আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদন।
