আন্তর্জাতিক

হেলিকপ্টারের মেশিনগান ট্রাকে বসিয়ে পরীক্ষা, নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভিডিও ঘিরে প্রশ্ন

মস্কো, ১৩ জুলাই: হেলিকপ্টারে ব্যবহারের জন্য তৈরি একটি ভারী মেশিনগান ট্রাকের উপর বসিয়ে পরীক্ষা করার সময় নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে কয়েকজন রুশ সেনাকে অস্ত্রটির কাছ থেকে দ্রুত সরে যেতে দেখা যায়। একজন গুলির সম্ভাব্য পথ থেকে শেষ মুহূর্তে নিচু হয়ে নিজেকে রক্ষা করেন। অস্ত্রটিকে সোভিয়েত আমলে তৈরি YakB-12.7 মডেলের চার ব্যারেলের মেশিনগান বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাধারণত Mi-24 যুদ্ধ হেলিকপ্টারে এই অস্ত্র ব্যবহৃত হয়। তবে ভিডিওটির স্থান, সময় এবং ঘটনার পূর্ণ বিবরণ রুশ কর্তৃপক্ষ এখনও প্রকাশ করেনি। ফলে দৃশ্যটির সব দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কী ঘটল?

ভিডিওতে দেখা যায়, একটি সামরিক ট্রাকের পিছনের অংশে ঘূর্ণনযোগ্য কাঠামোর সঙ্গে মেশিনগানটি বসানো হয়েছে। একজন সেনা অস্ত্রটির পিছনে অবস্থান নিয়ে গুলি চালানো শুরু করেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অস্ত্রটি দ্রুত নিজের অক্ষের চারপাশে ঘুরতে থাকে। সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেও সেনা ভারসাম্য হারান এবং একসময় ছিটকে যান। সামনে থাকা অন্য একজন দ্রুত নিচু হয়ে গুলির পথ থেকে সরে আসেন। পরে কয়েকজনকে আবার ট্রাকটির কাছে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। ভিডিও শেষ হওয়ার পরে হাসি ও কথাবার্তার শব্দ শোনা যায়। তবে কারও আঘাত লেগেছিল কি না, তা দৃশ্যটি দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। কয়েকটি রুশ সামরিকপন্থী সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্ট সকলের নিরাপদ থাকার দাবি করেছে। সরকারি ভাবে হতাহত বা আহত হওয়ার কোনও তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

অস্ত্রটি কোথা থেকে আনা হয়েছিল?

ভিডিওতে দেখা মেশিনগানটি YakB-12.7 বলে দাবি করা হচ্ছে। এটি ১২.৭ মিলিমিটার ক্যালিবারের চার ব্যারেলের ঘূর্ণায়মান ভারী মেশিনগান। মূলত Mi-24 যুদ্ধ হেলিকপ্টারের নাকের নিচে থাকা নিয়ন্ত্রিত টারেটে বসানোর জন্য অস্ত্রটি তৈরি হয়েছিল। প্রযুক্তিগত তথ্য অনুযায়ী, এটি মিনিটে প্রায় চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার রাউন্ড পর্যন্ত গুলি ছুড়তে পারে। হেলিকপ্টারে ব্যবহারের সময় অস্ত্রটি শক্তিশালী কাঠামো, নিয়ন্ত্রিত টারেট এবং বিশেষ লক্ষ্যনির্ধারণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে।  ভিডিওতে সেই হেলিকপ্টার টারেটের বদলে অপেক্ষাকৃত খোলা একটি ট্রাক-মাউন্ট দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত ব্যবস্থাই নিরাপত্তা এবং নকশা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ড্রোন ঠেকানোর জন্য কি এই ব্যবস্থা?

ভিডিওটি প্রকাশ করা কয়েকটি অ্যাকাউন্টের দাবি, কম উচ্চতায় আসা ড্রোনের মোকাবিলায় অস্ত্রটিকে ট্রাকের উপর বসিয়ে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায় বলে এ ধরনের দলকে সাধারণত ভ্রাম্যমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা দল বলা হয়। তবে ভিডিওতে কোনও ড্রোন দেখা যায়নি। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রকও অস্ত্রটি কী উদ্দেশ্যে পরীক্ষা করা হচ্ছিল, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি। তাই ড্রোন প্রতিরোধের দাবিটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।

অস্ত্রটি হঠাৎ ঘুরতে শুরু করল কেন?

প্রথম দিকে কিছু প্রতিবেদনে মাউন্টের বোল্ট ভেঙে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ভিডিও থেকে সেটি নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় না। কোনও প্রযুক্তিগত তদন্তের ফলও প্রকাশ্যে আসেনি। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গুলি ছোড়ার সময় তৈরি প্রচণ্ড পিছমুখী ধাক্কা এবং ঘূর্ণনশক্তি সামলানোর মতো স্থিতিশীলতা মাউন্টটিতে ছিল না। অস্ত্রের সক্রিয় ব্যারেল যদি ঘূর্ণনের কেন্দ্রের সঙ্গে একই রেখায় না থাকে, তা হলে প্রতিটি গুলির ধাক্কা মাউন্টটিকে একদিকে ঘোরানোর শক্তি তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে দুর্বল আটকানো ব্যবস্থা বা অসম ভারসাম্য যুক্ত হলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো কাঠামো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে ঠিক কোন যন্ত্রাংশে ত্রুটি হয়েছিল, তা পরীক্ষা ছাড়া বলা সম্ভব নয়।

ভিডিওটি কি এআই দিয়ে তৈরি?

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরে সমাজমাধ্যমের একাংশ এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। দৃশ্যটির অস্বাভাবিক গতি ও পরিস্থিতি দেখে কেউ কেউ এটিকে এআই দিয়ে তৈরি বলেও দাবি করেন। অন্যদিকে কয়েকটি রুশ সামরিকপন্থী চ্যানেল ভিডিওটিকে আসল বলে জানিয়েছে। একটি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের দাবি, ভিডিওটি প্রথমে রুশ সামরিক ব্লগারদের একটি টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। তবু কোনও সরকারি উৎস মূল ভিডিও বা ঘটনার স্থান-তারিখ প্রকাশ করেনি। এই কারণে ভিডিওটিকে পুরোপুরি ভুয়ো বলা যেমন তাড়াহুড়ো হবে, তেমনই যাচাই ছাড়া নিশ্চিত সামরিক দুর্ঘটনা হিসেবেও তুলে ধরা ঠিক নয়।

সামরিক সরঞ্জাম বদলে ব্যবহারে কোথায় ঝুঁকি?

যুদ্ধের সময় পুরনো অস্ত্রকে নতুন কাজে লাগানো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বিমান বা হেলিকপ্টারের জন্য তৈরি অস্ত্র মাটিতে ব্যবহার করতে হলে শুধু একটি স্ট্যান্ডে বসালেই হয় না। অস্ত্রের ওজন, প্রতি মিনিটে গুলির সংখ্যা, ধাক্কার দিক, ঘূর্ণন, গোলাবারুদের সরবরাহ এবং জরুরি ভাবে গুলি বন্ধ করার ব্যবস্থা—সবকিছুর নতুন করে পরীক্ষা প্রয়োজন। এই ভিডিওতে কোনও বড় ক্ষতি না হয়ে থাকলেও ঘটনাটি দেখিয়েছে, অপরীক্ষিত কাঠামোয় উচ্চক্ষমতার অস্ত্র বসালে সেটি শত্রুর পাশাপাশি নিজের দলের জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ভিডিওটির স্থান ও সময় এখনও অজানা। রুশ কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত না জানানো পর্যন্ত ঘটনাটির কারণ এবং প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।