দেশ

কুদানকুলাম প্রকল্পের নথি ডার্ক ওয়েবে, আংশিক তথ্য ফাঁসের কথা জানাল রিলায়্যান্স

নয়াদিল্লি: তামিলনাড়ুর কুদানকুলাম পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প সংক্রান্ত হাজার হাজার নথি ডার্ক ওয়েবে প্রকাশের দাবি উঠেছে। ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’ নামে একটি র‌্যানসমওয়্যার গোষ্ঠী ওই তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রকল্পের ঠিকাদার রিলায়্যান্স গোষ্ঠী তাদের তথ্যের একাংশ ফাঁস হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। তবে প্রকাশিত নথিগুলি পরমাণু কেন্দ্রের মূল নিরাপত্তা বা চুল্লি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বলে জানিয়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া বা NPCIL।

এক স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা গবেষকের দাবি, ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে কুদানকুলাম প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ১৯ হাজার ফাইল রয়েছে। সেগুলির মোট আয়তন প্রায় ১৪.৩ গিগাবাইট। নথিগুলি ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের। তবে সব নথির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

ফাঁস হওয়া নথিতে কী রয়েছে?

প্রকাশিত ফাইলের প্রাথমিক পর্যালোচনায় নির্মীয়মাণ ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের বায়ু চলাচল ও শীতলীকরণ ব্যবস্থার কিছু কথিত নকশা পাওয়া গিয়েছে। একটি সাধারণ নিয়ন্ত্রণকক্ষের তলার বিন্যাস, সরবরাহকারী সংস্থার তালিকা, যন্ত্রাংশ পরিদর্শনের ছবি, বৈঠকের নথি এবং বিমা সংক্রান্ত কাগজপত্রও সেখানে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

নথিগুলির মধ্যে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রোসাটমের সরবরাহ করা চুল্লির মূল ব্যবস্থার কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে সেগুলি নির্মাণকাজ, সহায়ক পরিকাঠামো এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হচ্ছে।

কোন সার্ভার থেকে তথ্য বাইরে এল?

রিলায়্যান্স গোষ্ঠীর বক্তব্য, তৃতীয় পক্ষের তথ্যকেন্দ্র পরিষেবা সংস্থা ইয়োটার সার্ভারে রাখা তাদের কিছু তথ্য ফাঁস হয়েছে। ঘটনাটি কেন্দ্রীয় সরকারকে জানানো হয়েছে। তবে কোন কোন নথি বাইরে এসেছে, তার বিস্তারিত তালিকা এখনও প্রকাশ করেনি সংস্থাটি।

ইয়োটা জানিয়েছে, গত ২৯ মে রিলায়্যান্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের একটি সার্ভারে সন্দেহজনক তৎপরতা ধরা পড়ে। সেই তৎপরতা বন্ধ করে সম্ভাব্য র‌্যানসমওয়্যার চালানোর চেষ্টা ঠেকানো হয়েছিল বলে সংস্থার দাবি। জুনের শেষে বাইরের একটি গোষ্ঠী তথ্য চুরির দাবি করেছে বলে ইয়োটাকে জানায় রিলায়্যান্স। ইয়োটা জানিয়েছে, সেই দাবির সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।

পরমাণু কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে কী জানিয়েছে NPCIL?

NPCIL-এর বক্তব্য, প্রকাশ্যে আসা নথিগুলি কুদানকুলাম প্রকল্পের সাধারণ সহায়ক পরিষেবার সঙ্গে সম্পর্কিত। পরমাণু নিরাপত্তা বা কেন্দ্রের সুরক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সেগুলির যোগ নেই।

ফলে ঘটনাটিকে সরাসরি কুদানকুলাম পরমাণু কেন্দ্র হ্যাক বলা ঠিক হবে না। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি প্রকল্পের এক ঠিকাদারের ব্যবহৃত তৃতীয় পক্ষের সার্ভার থেকে তথ্য ফাঁসের অভিযোগ।

তবে সহায়ক পরিকাঠামো ও অনুমোদিত সরবরাহকারীদের তথ্যও নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের নথি ব্যবহার করে প্রকল্পের সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রবেশাধিকার এবং সহায়ক পরিকাঠামো সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে বলে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। কোনও পক্ষ বাস্তবে সেই তথ্য অপব্যবহার করেছে—এমন প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।

কুদানকুলাম প্রকল্প কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলায় অবস্থিত কুদানকুলামে বর্তমানে দুটি চুল্লি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১,০০০ মেগাওয়াট। চালু থাকা দুই ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা ২,০০০ মেগাওয়াট।

রিলায়্যান্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ২০১৮ সালে ৩ ও ৪ নম্বর ইউনিটের কিছু পরিকাঠামো নির্মাণের বরাত পেয়েছিল। নির্মীয়মাণ ওই দুই ইউনিটের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ২,০০০ মেগাওয়াট হওয়ার কথা। প্রকাশিত নথিগুলির বড় অংশ ওই নির্মাণকাজের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে।

২০১৯ সালেও কুদানকুলামের প্রশাসনিক নেটওয়ার্কে ক্ষতিকর সফটওয়্যার শনাক্ত হয়েছিল। সে সময় NPCIL জানিয়েছিল, মূল পরিচালন ব্যবস্থা আলাদা নেটওয়ার্কে থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা আক্রান্ত হয়নি। বর্তমান ঘটনার সঙ্গে পুরনো ওই ঘটনার কোনও সম্পর্ক এখনও পাওয়া যায়নি।

তদন্তে এখন কী দেখা হচ্ছে?

ঘটনাটি নিয়ে রিলায়্যান্সের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে NPCIL। কেন্দ্রীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা CERT-In-ও বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। প্রকাশিত নথিগুলি কতটা আসল, সেগুলি কীভাবে বাইরে এল এবং ঠিক কতটা তথ্য ফাঁস হয়েছে—তদন্তে এখন মূলত এই বিষয়গুলি যাচাই করা হচ্ছে।

পরমাণু নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে নথিগুলির যোগ থাকার দাবি NPCIL নাকচ করেছে। তবে ঠিকাদারি সংস্থার তথ্য সুরক্ষায় কোথায় ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত সরকারি তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি।

Avatar photo

Bapan Biswas

বাপন বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। তিনি সাইটের সম্পাদকীয় পরিকল্পনা, তথ্য যাচাই এবং সংবাদ প্রকাশনার দায়িত্বে রয়েছেন। দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা ও বিনোদনের খবর সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে সহজ বাংলায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।