বেআইনি মদ-গাঁজার ঠেকের বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে অভিযানের নির্দেশ শুভেন্দুর
কলকাতা: বারুইপুরের সূর্যপুর-কাণ্ডের পর রাজ্য জুড়ে বেআইনি মদ, গাঁজা ও মাদক বিক্রির ঠেকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার সূর্যপুরে নতুন পুলিশ ফাঁড়ির উদ্বোধনে গিয়ে তিনি জানান, আগামী দু’সপ্তাহ রাজ্যজুড়ে এই ধরনের বেআইনি আস্তানার বিরুদ্ধে পুলিশকে আরও কড়া পদক্ষেপ করতে হবে।
বারুইপুরে নাবালিকাকে যৌন নির্যাতন ও খুনের অভিযোগ ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, সেই ঘটনার প্রসঙ্গ টেনেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সমাজে বেআইনি মদ ও মাদকের আস্তানা অপরাধের পরিবেশ তৈরি করছে। তাঁর মতে, শুধু শহর বা সীমান্ত এলাকা নয়, গ্রামীণ এলাকাতেও এই ধরনের ঠেক চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
সূর্যপুর ফাঁড়ি থেকে কড়া বার্তা
শনিবার সূর্যপুরে নতুন পুলিশ ফাঁড়ির উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্ত এবং জেলা পুলিশের আধিকারিকরা। তাঁদের সামনেই তিনি পুলিশকে বিশেষ অভিযান শুরু করার কথা বলেন।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, কোথাও বেআইনি মদের ঠেক, গাঁজা বা অন্য মাদক বিক্রির জায়গা থাকলে সাধারণ মানুষ যেন পুলিশকে জানান। শুধু নিয়মিত ধরপাকড় নয়, গ্রামগঞ্জে এই নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রশাসনিক মহলের ব্যাখ্যা, এই নির্দেশের ফলে আগামী কয়েক দিনে জেলাভিত্তিক অভিযান, নজরদারি এবং স্থানীয় সূত্রের তথ্যের উপর ভিত্তি করে ধরপাকড় বাড়তে পারে। তবে কোনও নির্দিষ্ট জায়গা বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইন মেনে প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতেই এগোতে হবে।
বারুইপুর কাণ্ডের সঙ্গে মাদকের প্রসঙ্গ কেন
বারুইপুরে নাবালিকার মৃত্যুর ঘটনায় ইতিমধ্যেই একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। অপরাধের প্রকৃতি, স্থানীয় নিরাপত্তা, রাতের নজরদারি এবং অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনের উপর চাপ বাড়ছে। এই আবহেই মুখ্যমন্ত্রী বেআইনি মদ ও মাদকের ঠেকের প্রসঙ্গ সামনে আনেন।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। বারুইপুরের মূল মামলার তদন্ত এখনও চলছে। তাই এই অপরাধের সঙ্গে কোনও নির্দিষ্ট বেআইনি ঠেক বা মাদকচক্রের সরাসরি যোগ এখনই প্রমাণিত বলা যাবে না। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে প্রশাসনিক উদ্বেগ এবং তদন্তের সম্ভাব্য দিক হিসেবেই দেখা উচিত।
দুই পরিবারের সঙ্গে দেখা
সূর্যপুর সফরে মুখ্যমন্ত্রী নাবালিকার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। একই সঙ্গে গণপিটুনিতে নিহত ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেন। দুই পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গণপিটুনিতে নিহত ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের পরিবারের হাতে ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাদাকে সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরিও দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তাঁকে সূর্যপুরের নতুন পুলিশ ফাঁড়িতেই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
নাবালিকার পরিবারকেও সহায়তা করা হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। তবে সেই সহায়তার বিস্তারিত তিনি প্রকাশ করেননি। তাঁর বক্তব্য, পরিবার চাইলে নিজেরাই তা জানাবে।
নতুন ফাঁড়ি নিয়ে প্রশাসনের আশা
নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবির মধ্যেই সূর্যপুরে নতুন পুলিশ ফাঁড়ি চালু হল। স্থানীয়দের একাংশের আশা, এর ফলে এলাকায় পুলিশি উপস্থিতি বাড়বে এবং অভিযোগ জানানো সহজ হবে। বিশেষ করে রাতের সময় টহল, সন্দেহজনক জমায়েত, বেআইনি মদ বা মাদক বিক্রির অভিযোগে দ্রুত পদক্ষেপ—এই বিষয়গুলিতে ফাঁড়ির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে শুধু ফাঁড়ি তৈরি করলেই পরিস্থিতি বদলাবে না। অভিযোগ নেওয়ার গতি, তদন্তের মান, স্থানীয় সূত্রের ব্যবহার এবং নিয়মিত নজরদারি, এসবের উপরই বাস্তব ফল নির্ভর করবে।
প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বেআইনি মদ ও মাদকবিরোধী অভিযান সাধারণত কয়েক দিনের তৎপরতায় শেষ হয়ে যায়, এমন অভিযোগ অনেক সময় ওঠে। তাই এই অভিযান কতটা ধারাবাহিক হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। গ্রামাঞ্চলে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় দালালচক্র, ভয়ের পরিবেশ এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তা, এসবও বড় চ্যালেঞ্জ।
বারুইপুরের ঘটনা প্রশাসনকে নতুন করে সতর্ক করেছে। এখন পুলিশের সামনে একসঙ্গে তিনটি কাজ, মূল অপরাধের তদন্ত এগিয়ে নেওয়া, গণপিটুনির ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করা এবং বেআইনি মদ-মাদক চক্রের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক অভিযান চালানো।
