লন্ডন প্রিমিয়ারের পর আলোচনায় নোলানের ‘দ্য ওডিসি’, প্রথম প্রতিক্রিয়ায় কী উঠে এল?
লন্ডন: মুক্তির আগেই বছরের সবচেয়ে আলোচিত ছবিগুলির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’। এবার লন্ডনে বিশ্বপ্রিমিয়ার এবং আমেরিকার কয়েকটি আগাম প্রদর্শনীর পর ছবিটি নিয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। বিশাল পরিসরের দৃশ্যায়ন, আইম্যাক্সে নির্মাণ, অভিনয় এবং পুরাণের গল্পে মানবিক টান—এই চারটি দিক বিশেষভাবে প্রশংসা পেয়েছে।
তবে এগুলি এখনও প্রথম প্রদর্শনীতে উপস্থিত সমালোচক ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক মতামত। পূর্ণাঙ্গ সমালোচনা এবং সাধারণ দর্শকের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের পরেই ছবিটি নিয়ে আরও নিরপেক্ষ ধারণা পাওয়া যাবে। তাই মুক্তির আগেই একে নিশ্চিতভাবে বছরের সেরা ছবি ঘোষণা করা ঠিক হবে না।
প্রথম প্রতিক্রিয়ায় কোন দিকগুলি প্রশংসা পেয়েছে?
ছবিটি দেখার পর অনেকেই নোলানের নির্মাণের ব্যাপ্তি এবং দৃশ্য পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধ, সমুদ্রযাত্রা এবং অজানা বিপদের দৃশ্যগুলিকে শুধু বড় করে দেখানোর বদলে গল্পের চরিত্রগুলির ভয়, ক্লান্তি ও মানসিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় জানা যাচ্ছে।
বিশেষ করে আইম্যাক্সে ধারণ করা বিস্তৃত দৃশ্য, নির্মাণসজ্জা এবং বড় মাপের সংঘর্ষের অংশগুলি প্রশংসিত হয়েছে। নোলান এর আগেও বড় পর্দার জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তবে ‘দ্য ওডিসি’ তাঁর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত কাজগুলির একটি বলে মনে করছেন প্রথম প্রদর্শনীর কয়েকজন দর্শক।
প্রথম প্রতিক্রিয়ায় আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। ছবির কিছু অংশে আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তার আবহ প্রত্যাশার তুলনায় বেশি। গ্রিক পুরাণের দানব, প্রতিকূল প্রকৃতি ও মৃত্যু-ভয়ের দৃশ্যগুলিকে নোলান কেবল রোমাঞ্চ হিসেবে দেখাননি; মানুষের অসহায়তা এবং ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষাও গল্পের কেন্দ্রে রেখেছেন বলে মত প্রকাশ করেছেন কয়েকজন সমালোচক।
কোন অভিনেতাদের অভিনয় নিয়ে আলোচনা?
ওডিসিউসের ভূমিকায় ম্যাট ডেমনের অভিনয় প্রথম প্রদর্শনীর পর বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। দীর্ঘ যুদ্ধের পর ঘরে ফেরার চেষ্টা করা এক ক্লান্ত কিন্তু দৃঢ়চেতা মানুষের চরিত্রে তাঁর সংযত অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন একাধিক সমালোচক।
অ্যান হ্যাথাওয়ে এবং টম হল্যান্ডের কাজও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি চমক দিয়েছেন রবার্ট প্যাটিনসন। অ্যান্টিনোয়াস চরিত্রে তাঁর অভিনয়ে কৌশল, নিষ্ঠুরতা এবং অস্বস্তিকর আকর্ষণের মিশ্রণ রয়েছে বলে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য এগুলি এখনও সীমিত সংখ্যক দর্শকের মতামত; মুক্তির পর বৃহত্তর দর্শকের প্রতিক্রিয়া ভিন্নও হতে পারে।
ছবিটির মুখ্য অভিনয়শিল্পীদের তালিকায় ম্যাট ডেমন, টম হল্যান্ড, অ্যান হ্যাথাওয়ে, রবার্ট প্যাটিনসন, লুপিতা নিয়ংও, জেন্ডায়া এবং শার্লিজ থেরন রয়েছেন। পরিচালনা ও চিত্রনাট্যের দায়িত্বে রয়েছেন ক্রিস্টোফার নোলান। তাঁর সঙ্গে ছবিটি প্রযোজনা করেছেন এমা টমাস।
‘দ্য ওডিসি’র গল্প কী নিয়ে?
হোমারের প্রাচীন মহাকাব্য অবলম্বনে তৈরি ছবিটির কেন্দ্রে রয়েছেন গ্রিক বীর ওডিসিউস। ট্রয়ের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নিজের রাজ্য ইথাকায় ফিরে যাওয়ার পথে তাঁকে দীর্ঘ ও বিপজ্জনক যাত্রার মুখোমুখি হতে হয়।
এই যাত্রা শুধু সমুদ্র, যুদ্ধ বা অতিপ্রাকৃত বিপদের বিরুদ্ধে লড়াই নয়। ঘরে ফেরার ইচ্ছা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, সময়ের পরিবর্তন এবং ক্ষমতার মূল্য—গল্পটির ভিতরে এই প্রশ্নগুলিও রয়েছে। ফলে মূল কাহিনিটি বহু শতাব্দীর পুরনো হলেও তার আবেগ বর্তমান দর্শকের কাছেও পরিচিত।
ছবির আনুষ্ঠানিক পরিচিতিতে একে পুরাণনির্ভর বিশাল মাপের অভিযান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। হোমারের এই কাহিনি প্রথমবার সম্পূর্ণভাবে আইম্যাক্স চলচ্চিত্র প্রযুক্তিতে বড় পর্দায় আনা হয়েছে বলে নির্মাতাদের দাবি।
প্রশংসার পাশাপাশি কী সমালোচনা রয়েছে?
প্রথম প্রতিক্রিয়ার অধিকাংশ ইতিবাচক হলেও সবাই ছবিটিকে নিখুঁত বলেননি। একজন সমালোচকের মতে, গল্পের কয়েকটি অংশের গতি কিছুটা ভারী এবং নির্মাণ সব জায়গায় সমান মসৃণ নয়। তবে শেষ অংশে দীর্ঘ যাত্রার আবেগপূর্ণ পরিণতি সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে বলে তাঁর মত।
এই মিশ্র মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আগাম প্রদর্শনীর প্রতিক্রিয়া অনেক সময় প্রচারপর্বের উত্তেজনার মধ্যে প্রকাশিত হয়। তাই শুধু প্রশংসামূলক কয়েকটি মন্তব্য দেখে দর্শকের প্রত্যাশা অত্যধিক বাড়ানো ঠিক হবে না। ছবির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য গল্প, গতি, অভিনয় এবং প্রায় তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্য—সব দিকই বিবেচনা করতে হবে।
প্রায় তিন ঘণ্টার ছবি, দর্শকদের কী জানা দরকার?
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ছবিটির দৈর্ঘ্য প্রায় তিন ঘণ্টা। ফলে প্রেক্ষাগৃহে দেখার পরিকল্পনা করলে দর্শকদের সময় হাতে রেখে যাওয়াই সুবিধাজনক হবে। দীর্ঘ ছবিতে গল্পের ধীর অংশ থাকতেই পারে; তবে নোলানের কাজ বড় পর্দা এবং শব্দব্যবস্থায় দেখার জন্য তৈরি হওয়ায় প্রেক্ষাগৃহের মানও অভিজ্ঞতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ছবিটি সম্পূর্ণ আইম্যাক্স চলচ্চিত্র ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে। তবে সব প্রেক্ষাগৃহে একই ধরনের আইম্যাক্স বা চলচ্চিত্র-প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকে না। টিকিট কাটার আগে প্রেক্ষাগৃহে কোন সংস্করণ দেখানো হচ্ছে, সেটি দেখে নেওয়া ভালো। সাধারণ পর্দাতেও ছবিটি মুক্তি পাবে।
মুক্তি কবে?
নির্মাতাদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, ‘দ্য ওডিসি’ ১৭ জুলাই ২০২৬ বিশ্বজুড়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে। মুক্তির দিন যত এগিয়ে আসবে, পূর্ণাঙ্গ সমালোচনা, দর্শকের মতামত এবং বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনের বিস্তারিত আরও পরিষ্কার হবে।
কেন ছবিটি নিয়ে এত আগ্রহ?
‘ওপেনহাইমার’-এর পর নোলানের পরবর্তী ছবি হওয়ায় প্রত্যাশা শুরু থেকেই বেশি ছিল। তার সঙ্গে হোমারের মহাকাব্য, বড় তারকাদের উপস্থিতি এবং সম্পূর্ণ আইম্যাক্সে নির্মাণ—সব মিলিয়ে ছবিটি সাধারণ একটি মুক্তির চেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত বড় আয়োজন নয়, ওডিসিউসের যাত্রা দর্শককে কতটা ছুঁতে পারে, সেটিই ছবিটির আসল পরীক্ষা। প্রথম প্রতিক্রিয়া আশাব্যঞ্জক। কিন্তু ১৭ জুলাইয়ের পর সাধারণ দর্শকের রায়ই বলে দেবে নোলানের এই দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা সত্যিই সময়ের পরীক্ষায় টিকবে কি না।
তথ্যসূত্র: ছবিটির আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইট, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্য এবং বিশ্বপ্রিমিয়ার-পরবর্তী আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রতিবেদন।
