আন্তর্জাতিক

ইরান হত্যার চেষ্টা করলে কঠোর পাল্টা হামলা, হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

ওয়াশিংটন: ইরান তাঁকে হত্যা বা হত্যার চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর সামরিক জবাব দেবে বলে হুঁশিয়ারি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক মাধ্যমের বার্তায় তিনি দাবি করেছেন, এমন পরিস্থিতির জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে আগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে তার পরে আরও কয়েক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে তাঁর দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকেও ওই সংখ্যা নিয়ে পৃথক বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এই হুঁশিয়ারির সময়ে নতুন কোনও হত্যাচেষ্টা ঘটেছে—এমন নিশ্চিত তথ্য সামনে আসেনি। ফলে ট্রাম্পের বক্তব্যকে সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে আগাম রাজনৈতিক ও সামরিক সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

কী বলেছেন ট্রাম্প?

ট্রাম্পের বক্তব্য, ইরান তাঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নিলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া রয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এই নির্দেশ এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে এবং প্রয়োজন হলে তার মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে সামরিক হুমকি এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে আলোচনা—দুই প্রক্রিয়াই চলছে।

নতুন হত্যার পরিকল্পনার প্রমাণ মিলেছে কি?

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি মার্কিন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সম্ভাব্য নতুন হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে। তবে ওই তথ্যের স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি এবং ইরানও অভিযোগটির সত্যতা স্বীকার করেনি।

ট্রাম্প নিজেও জানিয়েছেন, তাঁকে অবিলম্বে হত্যার কোনও নতুন বা নিশ্চিত পরিকল্পনা রয়েছে—এমন গোয়েন্দা তথ্য তাঁর কাছে নেই। তবে তিনি দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে।

তাই “ইরান ট্রাম্পকে হত্যার নতুন পরিকল্পনা করেছে”—এভাবে নিশ্চিত ভাষায় লেখা ঠিক হবে না। বিষয়টি এখনও প্রকাশিত গোয়েন্দা দাবি এবং পাল্টা রাজনৈতিক বক্তব্যের স্তরেই রয়েছে।

কাসেম সোলেমানির মৃত্যুর পর থেকেই উত্তেজনা

২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেমানি নিহত হন। ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদে ওই হামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

সোলেমানির মৃত্যুর পর ইরানের বিভিন্ন নেতা ও গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রও অতীতে ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসনের কয়েকজন প্রাক্তন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ইরানি হুমকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে বর্তমান অভিযোগকে আগের হুমকিগুলির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হলেও নতুন পরিকল্পনার নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।

আলোচনা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্য আলাদা

সামরিক হুঁশিয়ারির মধ্যেই ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান আলোচনা চালিয়ে যেতে চেয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাতে সম্মতি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, আগের সাময়িক যুদ্ধবিরতি আর কার্যকর নেই।

ইরান অবশ্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলোচনা শুরুর আবেদন করার দাবি অস্বীকার করেছে। তেহরানের বক্তব্য, কাতারের মধ্যস্থতায় বার্তা আদান-প্রদান ও উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা চলছে। কাতারের একটি প্রতিনিধিদলও মধ্যস্থতা জোরদার করতে ইরান সফর করেছে।

ফলে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু দুই পক্ষ আলোচনার সূচনা ও যুদ্ধবিরতির অবস্থান নিয়ে আলাদা ব্যাখ্যা দেওয়ায় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এখনও অনিশ্চিত।

হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিশ্বের মোট তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। সমুদ্রপথে হওয়া মোট বিশ্ব তেল বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি হরমুজের উপর নির্ভরশীল ছিল।

এই পথে হামলা, জাহাজ চলাচলে বাধা অথবা দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হলে অপরিশোধিত তেলের দাম, জাহাজের বীমা খরচ ও পরিবহণ ব্যয় বাড়তে পারে। তার প্রভাব ভারতসহ তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলির বাজারেও পড়ার আশঙ্কা থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক। অন্যদিকে তেহরান প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলের নিয়ম নিয়ে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছে। এই মতবিরোধই বর্তমান আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা।

সাধারণ মানুষের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?

সামরিক সংঘাত না বাড়লেও দীর্ঘদিন উত্তেজনা চললে আন্তর্জাতিক তেলের দাম অস্থির থাকতে পারে। এর সঙ্গে জাহাজভাড়া এবং পণ্য পরিবহণের বীমা খরচ বাড়লে জ্বালানি, রাসায়নিক সার, প্লাস্টিক ও পরিবহণনির্ভর বিভিন্ন পণ্যের খরচেও চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের পরেই নতুন যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে—এমন বলা যাবে না। আপাতত এটি কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি। বাস্তব পরিস্থিতি নির্ভর করবে ইরানের প্রতিক্রিয়া, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল এবং কাতারসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলির আলোচনার অগ্রগতির উপর।

এখন নজর কোথায়?

প্রথমত, ইরান ট্রাম্পের বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক জবাব কীভাবে দেয়। দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে কোনও যাচাইযোগ্য তথ্য সামনে আসে কি না। তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায় কি না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে সামরিক হুমকির মধ্যেও দুই দেশ আলোচনার পথ খোলা রাখে কি না। কারণ পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি যত বাড়বে, ভুল হিসাব বা ভুল বোঝাবুঝি থেকে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কাও তত বাড়বে।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।