৫২ হাজার কোটির প্রতিরক্ষা প্রস্তাবে DAC-এর ছাড়পত্র, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষায় জোর
DAC বৈঠকে ৫২ হাজার কোটি টাকার প্রতিরক্ষা প্রস্তাবে প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি দিল প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ। নয়াদিল্লি: ড্রোন হামলা মোকাবিলা, আকাশ প্রতিরক্ষা মজবুত করা এবং তিন বাহিনীর নজরদারি ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপ করল কেন্দ্র। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সভাপতিত্বে শুক্রবারের বৈঠকে সেনা, নৌবাহিনী এবং বায়ুসেনার জন্য একাধিক প্রতিরক্ষা ক্রয়প্রস্তাবে AoN দেওয়া হয়েছে।
তবে এই অনুমোদনকে এখনই চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। AoN হল প্রতিরক্ষা ক্রয় প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ। এরপর দরপত্র, প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন, পরীক্ষা, মূল্য আলোচনা এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের ধাপ পেরোলেই প্রকৃত চুক্তি হয়। তাই এই সিদ্ধান্তকে সরঞ্জাম কেনার পথে বড় পদক্ষেপ বলা যায়, কিন্তু সরাসরি কেনা হয়ে গেছে—এভাবে বলা যাবে না।
DAC বৈঠকে কী কী প্রস্তাবে ছাড়পত্র
DAC বৈঠকে সেনাবাহিনীর জন্য ড্রোন প্রতিরোধী ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা ‘আকাশ তরঙ্গ’, মানুষ বহনযোগ্য ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, খুব কম পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ট্যাঙ্কের সক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং জেটচালিত কামিকাজে ড্রোন ব্যবস্থার প্রস্তাবে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
নৌবাহিনীর জন্যও একাধিক প্রস্তাব অনুমোদনের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে আছে মাল্টি-ইনফ্লুয়েন্স গ্রাউন্ড মাইন, জাহাজভিত্তিক চালকবিহীন আকাশযান ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক চালনা ব্যবস্থার পরীক্ষার জন্য স্থলভিত্তিক পরীক্ষাকেন্দ্র।
বায়ুসেনার জন্য অনুমোদিত হয়েছে ডানা-যুক্ত উচ্চ-উচ্চতার দীর্ঘস্থায়ী নজরদারি প্ল্যাটফর্ম বা FW-HAPS। এই ধরনের ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় আকাশে থেকে নজরদারি, যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং দূর-সংবেদন কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আরও পড়ুন: ইসরোর দফতরে বোমা হামলার হুমকি! চেয়ারম্যানের অফিসে ই-মেল
ড্রোন মোকাবিলায় ‘আকাশ তরঙ্গ’
সেনাবাহিনীর জন্য অনুমোদিত প্রস্তাবগুলির মধ্যে ‘আকাশ তরঙ্গ’ বিশেষভাবে নজরকাড়া। বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রে ছোট ড্রোন, নজরদারি ড্রোন এবং কামিকাজে ড্রোন বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। সীমান্ত এলাকা বা সামনের সারির সেনা অবস্থান রক্ষায় এই ধরনের ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আকাশ তরঙ্গ’ সেনা ফরমেশনকে ড্রোন-হুমকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করবে। অর্থাৎ শুধু আক্রমণ নয়, প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষায় নতুন জোর
মানুষ বহনযোগ্য ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বা MPATGM পদাতিক বাহিনীর হাতে সাঁজোয়া হুমকি মোকাবিলার নতুন শক্তি দিতে পারে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান দ্রুত অগ্রসর হলে, সামনের সারির বাহিনীর হাতে এমন অস্ত্র থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
এর পাশাপাশি MRSAM এবং V-SHORADS সেনাবাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করবে। নিচু উচ্চতায় উড়ে আসা ড্রোন, হেলিকপ্টার বা অন্য আকাশ-হুমকির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে এই ধরনের ব্যবস্থা কাজে লাগতে পারে।
আরও পড়ুন: বর্ষার দাপুটে প্রত্যাবর্তন, ইসরোর উপগ্রহ চিত্রে উত্তর ভারতে ঘন মেঘের সারি
ট্যাঙ্কের সুরক্ষায় সক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা
ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যুদ্ধযানের নিরাপত্তা বাড়াতেও এই বৈঠকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা বা Active Protection System আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র বা রকেটচালিত হামলার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
বর্তমান সময়ে ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন-ভিত্তিক হামলা যুদ্ধক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ট্যাঙ্কের শুধু আক্রমণ ক্ষমতা নয়, টিকে থাকার ক্ষমতাও বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে।
কামিকাজে ড্রোন ব্যবস্থার প্রস্তাব
DAC বৈঠকে জেটচালিত কামিকাজে ড্রোন ব্যবস্থার প্রস্তাবও অনুমোদনের তালিকায় রয়েছে। এই ধরনের ড্রোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা যায়।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতগুলিতে ড্রোন যুদ্ধের গুরুত্ব বেড়েছে। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই ভারতীয় সেনাবাহিনী চালকবিহীন যুদ্ধক্ষমতা বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে বলে প্রতিরক্ষা মহলের একাংশের মত।
নৌবাহিনীর নজরদারি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা
নৌবাহিনীর জন্য জাহাজভিত্তিক চালকবিহীন আকাশযান ব্যবস্থা বা NSUAS অনুমোদনের তালিকায় রয়েছে। উন্নত সেন্সরযুক্ত এই ব্যবস্থা সমুদ্র অঞ্চলে নজরদারি, শত্রুপক্ষের গতিবিধি বোঝা এবং দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।
ভারত মহাসাগর অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় নৌবাহিনীর নজরদারি ক্ষমতা বাড়ানো শুধু সামরিক দিক থেকেই নয়, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তার দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
এর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক চালনা ব্যবস্থার পরীক্ষার জন্য স্থলভিত্তিক পরীক্ষাকেন্দ্র তৈরির প্রস্তাবও নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। নতুন প্রজন্মের নৌযানে বৈদ্যুতিক চালনা ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়তে পারে, তাই এই পরীক্ষাকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বায়ুসেনার জন্য দীর্ঘস্থায়ী নজরদারি প্ল্যাটফর্ম
বায়ুসেনার জন্য ডানা-যুক্ত উচ্চ-উচ্চতার দীর্ঘস্থায়ী নজরদারি প্ল্যাটফর্ম বা FW-HAPS-এ ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম দীর্ঘ সময় আকাশে থেকে নজরদারি, যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং দূর-সংবেদন কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সীমান্ত এলাকা, সমুদ্র অঞ্চল এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল জায়গায় দীর্ঘ সময় নজরদারির ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা বায়ুসেনাকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ?
প্রতিরক্ষা মহলের মতে, এই DAC বৈঠক থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণে ড্রোন প্রতিরোধ, আকাশ প্রতিরক্ষা, চালকবিহীন যুদ্ধব্যবস্থা, সাঁজোয়া যান সুরক্ষা এবং দীর্ঘস্থায়ী নজরদারিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
যুদ্ধক্ষেত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। শুধু বড় কামান বা যুদ্ধবিমান নয়, ছোট ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, নির্ভুল আঘাত এবং দ্রুত নজরদারিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়েই এই প্রস্তাবগুলি সামনে এসেছে।
শেষ কথা
প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকার প্রতিরক্ষা প্রস্তাবে DAC-এর প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি ভারতের সামরিক প্রস্তুতির দিক থেকে বড় পদক্ষেপ। সেনাবাহিনীর ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা, ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা, ট্যাঙ্কের সক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থা, নৌবাহিনীর চালকবিহীন নজরদারি ব্যবস্থা এবং বায়ুসেনার উচ্চ-উচ্চতার নজরদারি প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে তিন বাহিনীর প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য।
তবে শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, AoN মানেই চূড়ান্ত চুক্তি নয়। প্রকৃত ক্রয়, সরবরাহ এবং বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি নির্ভর করবে পরবর্তী প্রতিরক্ষা ক্রয় প্রক্রিয়ার উপর। তাই এখন নজর থাকবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং চূড়ান্ত চুক্তির দিকে।
সূত্র: প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন।
