নতুন পিএফ স্কিম কার্যকর, চাকরিজীবীদের বেতন ও সঞ্চয়ে কী প্রভাব পড়বে?
প্রভিডেন্ট ফান্ড বা পিএফ নিয়ে চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন থাকে। কত টাকা কাটা হবে, কখন টাকা তোলা যাবে, চাকরি বদলালে কী হবে-এসব বিষয় অনেকের কাছেই জটিল মনে হয়। সেই জায়গায় নতুন পিএফ স্কিম ২০২৬ কর্মীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন পিএফ স্কিম ২০২৬ কার্যকর হয়েছে ২৯ জুন থেকে। এর ফলে ১৯৫২ সালের পুরনো পিএফ স্কিমের জায়গায় নতুন নিয়ম চালু হল। তবে এতে কর্মীদের পুরনো পিএফ অ্যাকাউন্ট বা জমা টাকার কোনও ক্ষতি হবে না। আগের জমা টাকা, সুদ এবং সদস্যপদ আগের মতোই থাকবে।
পিএফ কাটার নিয়মে কী বদল এল?
নতুন স্কিমে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বাধ্যতামূলক পিএফ কাটার সীমা নিয়ে। বর্তমানে পিএফের জন্য বেতনসীমা ধরা হয়েছে ১৫,০০০ টাকা। এই বেতনসীমার ১২ শতাংশ হিসেবে কর্মীর বাধ্যতামূলক পিএফ কাটা দাঁড়ায় ১,৮০০ টাকা।
অর্থাৎ, কোনও কর্মীর মূল বেতন ১৫,০০০ টাকার বেশি হলেও আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক পিএফ কাটার হিসেব ওই সীমা পর্যন্তই ধরা হবে। তবে কর্মী চাইলে নিজের ইচ্ছায় বেশি টাকা পিএফে জমা করতে পারেন।
এই অতিরিক্ত জমাকে স্বেচ্ছা পিএফ বলা যেতে পারে। তবে কর্মী বেশি টাকা জমা করলেই নিয়োগকর্তা সেই অতিরিক্ত অংশের সমান টাকা জমা দিতে বাধ্য থাকবেন, এমন নয়। আলাদা চুক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম থাকলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।
তাই “সবার হাতে বেতন সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাবে” এমন বলা ঠিক নয়। বাস্তবে বিষয়টি নির্ভর করবে বেতনের কাঠামো, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম এবং কর্মী-নিয়োগকর্তার সিদ্ধান্তের ওপর।
টাকা তোলার নিয়ম সহজ করা হয়েছে
বিপদে বা জরুরি প্রয়োজনে পিএফের টাকা অনেক চাকরিজীবীর বড় ভরসা। নতুন স্কিমে পিএফ থেকে আংশিক টাকা তোলার নিয়ম আরও সহজভাবে সাজানো হয়েছে।
আগে বিভিন্ন কারণে টাকা তোলার জন্য অনেক আলাদা আলাদা নিয়ম ছিল। এখন সেগুলিকে কয়েকটি প্রধান ভাগে আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অসুস্থতা, পড়াশোনা, বিয়ে, বাড়ি কেনা, বাড়ি তৈরি, বাড়ি মেরামত, গৃহঋণ পরিশোধ এবং বিশেষ পরিস্থিতি।
নিজের বা পরিবারের সদস্যের চিকিৎসার জন্য টাকা তোলা যাবে। সন্তানের উচ্চশিক্ষা বা বিয়ের ক্ষেত্রেও পিএফ থেকে টাকা তোলার সুযোগ থাকবে। বাড়ি কেনা বা মেরামতের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে টাকা তোলা যেতে পারে।
তবে টাকা তোলার আগে যোগ্যতা, সদস্যপদের মেয়াদ এবং প্রয়োজনীয় নথি ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
২৫ শতাংশ টাকা অ্যাকাউন্টে রাখতে হবে
নতুন নিয়মে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রাখা হয়েছে। পিএফ অ্যাকাউন্টে মোট জমার অন্তত ২৫ শতাংশ টাকা রেখে দিতে হবে। এই হিসেবের মধ্যে কর্মীর জমা, নিয়োগকর্তার জমা এবং তার ওপর জমা সুদ ধরা হবে।
সহজভাবে বললে, পিএফ অ্যাকাউন্টের পুরো টাকা ইচ্ছেমতো তুলে নেওয়া যাবে না। আংশিক টাকা তুললেও কিছু সঞ্চয় ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিতে হবে।
এই নিয়মের উদ্দেশ্য হল, জরুরি সময়ে কর্মী যেন টাকা পান, আবার অবসরের সঞ্চয় পুরোপুরি শেষ না হয়ে যায়।
অনলাইনে কাজের সুবিধা বাড়বে
নতুন স্কিমে অনলাইন পরিষেবার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। পিএফ দাবি জমা দেওয়া, অ্যাকাউন্টের তথ্য দেখা, নমিনি পরিবর্তন, চাকরি বদলের পর অ্যাকাউন্ট স্থানান্তর—এসব কাজ আরও সহজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এর ফলে ভবিষ্যতে পিএফ সংক্রান্ত অনেক কাজ ঘরে বসেই করা সহজ হতে পারে। তবে ইপিএফও-র ব্যবস্থায় কোনও পরিবর্তন বা আপডেট চললে কিছু ক্ষেত্রে পরিষেবায় দেরি হতে পারে।
তাই পিএফের দাবি জমা দেওয়ার পর বারবার আবেদন না করে সরকারি পোর্টালে অবস্থান দেখে নেওয়া ভালো।
বেসরকারি পিএফ ট্রাস্টের কর্মীদের জন্য কী আছে?
অনেক বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পিএফ ট্রাস্ট থাকে। সেই ধরনের প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ক্ষেত্রেও নতুন স্কিমে নিয়ম আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।
টাকা জমা, হিসেব রাখা, নিরীক্ষা, কর্মীদের তথ্য আপডেট করা এবং ইপিএফও-র কাছে রিপোর্ট দেওয়ার বিষয়গুলোতে আরও কড়া নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এর ফলে বেসরকারি পিএফ ট্রাস্টে থাকা কর্মীদের সঞ্চয় ও অধিকার সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য হতে পারে।
কী কী আগের মতোই থাকছে?
নতুন স্কিম চালু হলেও পিএফের মূল কাঠামো পুরো বদলে যায়নি। সাধারণভাবে কর্মীর বেতন থেকে ১২ শতাংশ এবং নিয়োগকর্তার তরফে ১২ শতাংশ জমার নিয়ম বহাল রয়েছে।
কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হারে জমার নিয়ম থাকতে পারে। তবে সাধারণ কর্মীদের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ নিয়মই বেশি পরিচিত।
ইউএএন নম্বরও আগের মতোই থাকবে। চাকরি বদলালেও একই ইউএএন ব্যবহার করে পিএফ অ্যাকাউন্ট চালু রাখা যাবে।
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য পিএফের সুদের হার ৮.২৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। তাই নতুন স্কিম চালু হওয়া মানেই সুদের হার বদলে গেছে, এমন নয়।
সাধারণ চাকরিজীবীদের কী করা উচিত?
প্রথমে নিজের বেতনের স্লিপ ভালো করে দেখুন। পিএফ বাবদ কত টাকা কাটা হচ্ছে, তা মূল বেতন ও নিয়োগকর্তার জমার সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
যদি ১,৮০০ টাকার বেশি পিএফ কাটা হয়, তাহলে সেটি বাধ্যতামূলক কাটা নাকি স্বেচ্ছা সঞ্চয়—তা অফিসের মানবসম্পদ বিভাগ বা বেতন বিভাগ থেকে জেনে নিন।
যাঁরা ভবিষ্যতের জন্য বেশি সঞ্চয় করতে চান, তাঁদের জন্য অতিরিক্ত পিএফ জমা রাখা ভালো হতে পারে। তবে যাঁদের মাসে হাতে বেশি টাকা দরকার, তাঁদের নিজের বেতনের কাঠামো বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
টাকা তোলার আগে ২৫ শতাংশ ব্যালান্স রাখার নিয়ম, যোগ্যতা এবং প্রয়োজনীয় নথি ভালোভাবে দেখে নিন। ভুল তথ্য দিলে দাবি মঞ্জুর হতে দেরি হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, ইপিএফও কখনও ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেজে পাসওয়ার্ড, ওটিপি, আধার, প্যান বা ব্যাঙ্কের তথ্য চায় না। তাই পিএফের নামে কোনও ভুয়ো লিঙ্ক বা ফোন এলে ব্যক্তিগত তথ্য দেবেন না।
নতুন পিএফ স্কিম ২০২৬ কর্মীদের জন্য কিছু সুবিধা ও নমনীয়তা এনেছে। তবে পিএফের মূল উদ্দেশ্য এখনও অবসরের সঞ্চয় রক্ষা করা। তাই বর্তমানের প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা—দুটো দিক ভেবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।
