আন্তর্জাতিক

ইরানে মার্কিন বিমান হামলা, পাল্টা ড্রোন-রকেট ছুড়ল IRGC, হরমুজ ঘিরে উদ্বেগ

ওয়াশিংটন/তেহরান: হরমুজ প্রণালী ঘিরে ফের বাড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর পরই ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা IRGC পাল্টা জবাবের দাবি করেছে। ফলে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি সমঝোতার পর যে কূটনৈতিক স্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।

এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট

  • হরমুজ প্রণালীতে M/V Ever Lovely জাহাজে হামলার অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা বেড়েছে।
  • CENTCOM জানিয়েছে, ইরানের missile ও drone storage site-সহ coastal radar site লক্ষ্য করা হয়েছে।
  • ইরান পাল্টা মার্কিন অবস্থান লক্ষ্য করে জবাব দেওয়ার দাবি করেছে।
  • কোন কোন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা হতাহতের তথ্য এখনও পরিষ্কার নয়।
  • হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।
  • এই উত্তেজনা বাড়লে তেল বাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

কী অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র?

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা CENTCOM-এর বক্তব্য, ২৫ জুন হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ M/V Ever Lovely-এর ওপর হামলা হয়। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, এই হামলার পেছনে ইরানের ভূমিকা ছিল। সেই ঘটনার জবাব হিসেবেই ইরানের ভেতরে কয়েকটি সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা হয়েছে।

মার্কিন বাহিনীর দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল missile ও drone storage facility এবং উপকূলীয় radar site। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথে হামলা শুধু একটি জাহাজের ওপর আঘাত নয়, বরং গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য ঝুঁকি।

আরও পড়ুন : চাঞ্চল্যকর! বেজিং বিমান দুর্ঘটনা: ১০৯ তলা ‘চায়না জ়ুন’-এ আছড়ে পড়ল বিমান?

ট্রাম্পের মন্তব্যের পর বাড়ল চাপ

ঘটনার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। পরে CENTCOM-এর তরফে ইরানে হামলার কথা জানানো হয়। তবে এই হামলা নিয়ে ওয়াশিংটনের ভাষা যতটা কঠোর, ততটাই সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক মহল। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক সমঝোতা এখনও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ইরান যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত বোঝাপড়ার চেতনা লঙ্ঘন করেছে। অন্যদিকে তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, হরমুজ প্রণালীতে উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে তাদের নিরাপত্তা-স্বার্থকে উপেক্ষা করা যাবে না। এই দুই অবস্থানের সংঘাতই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

ইরানে মার্কিন হামলা ও হরমুজ প্রণালীর মানচিত্র


পাল্টা জবাবের দাবি IRGC-র

মার্কিন হামলার পর ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা IRGC দাবি করে, অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে পাল্টা জবাব দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কোন ঘাঁটি লক্ষ্য করা হয়েছে, কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতি কতটা—এসব বিষয়ে এখনও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা জরুরি। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দুই পক্ষই নিজের অবস্থান শক্তিশালী করে তুলে ধরে। ফলে সরকারি বিবৃতি, প্রত্যক্ষ তথ্য, সামরিক বিশ্লেষণ এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট মিলিয়ে দেখাই দায়িত্বশীল পথ।

জেডি ভ্যান্সের বার্তা

উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স ইরানকে কঠোর বার্তা দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি সমঝোতা মেনে চলেছে, কিন্তু হামলার জবাব দেওয়া হবে। ওয়াশিংটনের এই অবস্থান বুঝিয়ে দিচ্ছে, তারা হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা প্রশ্নে আপস করতে চাইছে না।

তবে সামরিক জবাবের পাশাপাশি কূটনৈতিক পথ খোলা থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ এই সংঘাত আরও ছড়ালে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নয়, উপসাগরীয় দেশগুলিও সরাসরি চাপের মুখে পড়বে।

হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। তাই এখানে সামান্য অস্থিরতাও জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে গেলে বা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে তেলের দাম, বীমা খরচ, পণ্য পরিবহণ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপর। সেই কারণেই হরমুজ প্রণালীর প্রতিটি সংঘাত দ্রুত বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় উঠে আসে।

সিরিক বন্দর ঘিরে কী জানা যাচ্ছে?

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক বন্দর এলাকা ঘিরেও বিস্ফোরণের খবর সামনে এসেছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঠিক কোথায় বিস্ফোরণ হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি কতটা এবং এটি মার্কিন হামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কি না—এসব বিষয়ে এখনও পরিষ্কার তথ্য নেই। তাই এই অংশে কোনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, সরকারি বিবৃতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তথ্য মিলিয়ে দেখাই সবচেয়ে নিরাপদ। অযাচাই ছবি বা ভিডিওর ওপর নির্ভর করে বড় দাবি করলে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে?

হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে প্রথম চাপ পড়ে জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম ওঠানামা করতে পারে, শিপিং route বদলাতে হতে পারে এবং বীমা খরচ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও কড়া হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি সীমিত সামরিক জবাবের মধ্যেই থাকে, তবে বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল যদি প্রভাবিত হয়, তবে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়বে।

সামনে কী নজর থাকবে?

এখন নজর থাকবে তিনটি বিষয়ের দিকে—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের অবস্থা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ। উপসাগরীয় দেশগুলি পরিস্থিতি শান্ত রাখতে ভূমিকা নেয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে ইরানে মার্কিন হামলা এবং IRGC-র পাল্টা জবাবের দাবি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান হল নিশ্চিত তথ্যের অপেক্ষা করা এবং অযাচাই দাবি ছড়ানো থেকে বিরত থাকা। কারণ হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

তথ্যসূত্র: CENTCOM, Reuters, ABC News ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন

Avatar photo

Bapan Biswas

বাপন বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। তিনি সাইটের সম্পাদকীয় পরিকল্পনা, তথ্য যাচাই এবং সংবাদ প্রকাশনার দায়িত্বে রয়েছেন। দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা ও বিনোদনের খবর সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে সহজ বাংলায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *