জিন্দ–সোনিপত পথে ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন চালু, কীভাবে চলবে নতুন পরিষেবা
ভারতের রেল পরিবহণে শুরু হল নতুন অধ্যায়। হরিয়ানার জিন্দ রেলস্টেশন থেকে দেশের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত যাত্রীবাহী ট্রেনের যাত্রার সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ট্রেনটি উত্তর রেলের জিন্দ–সোনিপত শাখায় চলবে।
দেশীয় প্রযুক্তিতে নকশা, নির্মাণ ও সংযোজন করা এই ট্রেনের মাধ্যমে ভারত হাইড্রোজেনচালিত রেল পরিষেবা ব্যবহারকারী অল্প কয়েকটি দেশের তালিকায় যুক্ত হল। তবে এটি এখনই সারা দেশের জন্য চালু হওয়া কোনও নতুন ট্রেনব্যবস্থা নয়। জিন্দ–সোনিপত পথে এর ব্যবহার মূলত প্রযুক্তি, খরচ, নিরাপত্তা ও নিয়মিত পরিচালনার অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের একটি প্রাথমিক প্রকল্প।
হরিয়ানার জিন্দ রেলস্টেশন থেকে জিন্দ–সোনিপত পথে ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেনের যাত্রার সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। pic.twitter.com/3R8RXPwPmG
— Starflix Bengali News (@StarflixBengali) July 17, 2026
হাইড্রোজেন ট্রেন কীভাবে চলে?
সাধারণ ডিজেল ট্রেনে জ্বালানি পুড়িয়ে ইঞ্জিন চালানো হয়। হাইড্রোজেন ট্রেনে সেই পদ্ধতি নেই। ট্রেনের ভিতরে রাখা জ্বালানি কোষে হাইড্রোজেন ও বাতাসের অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়। সেই বিদ্যুৎ ট্রেনের মোটর চালায়।
এই প্রক্রিয়ায় ট্রেন চলার সময় ধোঁয়া বা কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয় না। মূলত জলীয় বাষ্প ও কিছু তাপ তৈরি হয়। তাই বিদ্যুৎ সংযোগহীন পথে ডিজেল ট্রেনের বিকল্প হিসেবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন দেশে পরীক্ষা চলছে।
তবে ট্রেনটি চলার সময় দূষণ না হওয়া এবং পুরো ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত হওয়া এক কথা নয়। হাইড্রোজেন তৈরিতে কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস নাকি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার উপর সামগ্রিক পরিবেশগত লাভ নির্ভর করে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে হাইড্রোজেন তৈরি করা গেলে দূষণ কমানোর সুবিধা বেশি হয়।

ট্রেনটিতে কতটি কামরা রয়েছে?
ট্রেনটি মোট ১০টি কামরা নিয়ে তৈরি। এর মধ্যে দুটি শক্তিচালিত কামরা এবং আটটি যাত্রীবাহী কামরা রয়েছে। দুটি শক্তিচালিত কামরাতেই জ্বালানি কোষ, ব্যাটারি এবং হাইড্রোজেন রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
দুই শক্তিচালিত কামরার মিলিত ক্ষমতা প্রায় ২,৪০০ কিলোওয়াট, যা প্রায় ৩,২০০ অশ্বশক্তির সমান। প্রধানমন্ত্রীর দফতর ট্রেনটিকে বিশ্বের দীর্ঘতম ও শক্তিশালী হাইড্রোজেনচালিত যাত্রীবাহী ট্রেনগুলির অন্যতম বলে বর্ণনা করেছে।
ট্রেনটিতে একসঙ্গে প্রায় ২,৬০০ যাত্রী বহনের ব্যবস্থা রয়েছে। নকশা অনুযায়ী সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হলেও, জিন্দ–সোনিপত শাখায় আপাতত ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭৫ কিলোমিটার গতিতে চালানোর অনুমতি দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।
কোন পথে চলবে, সময়সূচি কী?
ট্রেনটির জন্য ৭৪০১০ এবং ৭৪০০৯ নম্বর অনুমোদন করেছে রেল মন্ত্রক। অনুমোদিত সময়সূচি অনুযায়ী, জিন্দ থেকে সোনিপতগামী ট্রেনটি সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে ছাড়বে এবং সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে সোনিপতে পৌঁছবে।
ফেরার পথে সোনিপত থেকে ট্রেনটি সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে রওনা দিয়ে দুপুর ১টায় জিন্দে পৌঁছবে। পরিষেবাটি প্রতিদিন চালানোর অনুমোদন রয়েছে। তবে উদ্বোধনী যাত্রার পর নিয়মিত সময়সূচিতে কোনও পরিবর্তন হলে উত্তর রেলের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
জিন্দ ও সোনিপতের মধ্যে ট্রেনটির নির্ধারিত বিরতি রয়েছে জিন্দ সিটি, পান্ডু পিন্ডারা, ললিত খেরা, ভামবেভা, ঈশাপুর খেরি, বুটানা, খান্দরাই, গোহানা, রাভরা, লাঠ, মোহানা হরিয়ানা এবং বারওয়াসনিতে।

হাইড্রোজেন কোথা থেকে ভরা হবে?
ট্রেনের জন্য জিন্দে বিশেষ হাইড্রোজেন সংরক্ষণ ও জ্বালানি ভরার কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৩,০০০ কিলোগ্রাম হাইড্রোজেন সংরক্ষণ করা যাবে।
পেট্রোলিয়াম ও বিস্ফোরক নিরাপত্তা সংস্থা এই কেন্দ্রে হাইড্রোজেন রাখা এবং ট্রেনে ভরার অনুমতি দিয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, পুরো ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসারে তৈরি এবং জার্মানির একটি স্বাধীন প্রযুক্তি যাচাইকারী সংস্থাকে দিয়ে নিরাপত্তা পরীক্ষা করানো হয়েছে।
নিরাপত্তার জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে?
হাইড্রোজেন অত্যন্ত দাহ্য গ্যাস। তাই ট্রেন ও জ্বালানি ভরার কেন্দ্রে গ্যাস বেরিয়ে যাচ্ছে কি না, আগুন বা অস্বাভাবিক তাপ তৈরি হচ্ছে কি না—তা ধরার জন্য আলাদা যন্ত্র বসানো হয়েছে।
কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে হাইড্রোজেন সরবরাহ নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। ট্রেনের ভিতরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা সব সময় সক্রিয় থাকবে। চালকের সামনে থাকা পর্দায় পুরো ব্যবস্থার অবস্থা দেখা যাবে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিকর্মীরাও ট্রেনে থাকবেন।
ট্রেনটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দিল্লির শকুরবস্তিতে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। জিন্দের হাইড্রোজেন ভরার কেন্দ্রও দিনরাত নজরদারির আওতায় থাকবে।
সাধারণ যাত্রীদের কী সুবিধা হতে পারে?
হাইড্রোজেন ট্রেন ডিজেল ট্রেনের মতো ধোঁয়া ছাড়ে না এবং চলার সময় তুলনামূলকভাবে কম শব্দ তৈরি করে। যেসব রেলপথে উপর দিয়ে বৈদ্যুতিক তার বসানো হয়নি, সেখানে ভবিষ্যতে এটি ডিজেলের একটি বিকল্প হতে পারে।
তবে নতুন প্রযুক্তির খরচ, হাইড্রোজেনের নিয়মিত সরবরাহ, জ্বালানি ভরার সময়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারে নির্ভরযোগ্যতা এখনও বাস্তব পরিষেবায় পরীক্ষা করা প্রয়োজন। জিন্দ–সোনিপত প্রকল্প থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই অন্য পথে এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
ভারতীয় রেলের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
দেশের অধিকাংশ প্রধান রেলপথ ইতিমধ্যেই বিদ্যুতায়িত। তা সত্ত্বেও কিছু শাখায় ডিজেলচালিত ট্রেনের ব্যবহার রয়েছে। এমন পথে হাইড্রোজেন প্রযুক্তি কার্যকর ও আর্থিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই ট্রেনটি তাই শুধু একটি নতুন যাত্রীবাহী পরিষেবা নয়। এটি ভবিষ্যতে হাইড্রোজেনচালিত রেলব্যবস্থা কতটা বাস্তবসম্মত হতে পারে, তারও পরীক্ষা। জ্বালানির খরচ, নিরাপত্তা, যাত্রী পরিষেবা এবং নিয়মিত পরিচালনার ফলাফলই ঠিক করবে এই প্রযুক্তি আরও পথে ছড়িয়ে দেওয়া হবে কি না।
