রাজ্য

কর্ণসুবর্ণে স্কুলগাড়িতে ট্রেনের ধাক্কা, জেলা পুলিশের হিসাবে চার পড়ুয়া-সহ মৃত ৫

মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণের কাছে রেললাইন পারাপারের একটি গেটে স্কুলগাড়ির সঙ্গে যাত্রীবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ। মৃতদের মধ্যে চারজন স্কুলপড়ুয়া এবং একজন সাইকেল আরোহী। দুর্ঘটনায় আহত আরও চারজন মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের মধ্যে দু’জনের আঘাত গুরুতর বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।

শুক্রবার সকাল ৬টা ৪১ মিনিট নাগাদ কাটোয়া–আজিমগঞ্জ শাখার ২৪এ/২ নম্বর রেলগেটে দুর্ঘটনাটি ঘটে। পড়ুয়াদের নিয়ে একটি ছোট গাড়ি রেললাইন পার হওয়ার সময় ৫৩০৫৪ নম্বর নিমতিতা–কাটোয়া যাত্রীবাহী ট্রেন সেটিতে ধাক্কা দেয়। একই সময়ে রেললাইন পার হচ্ছিলেন এক সাইকেল আরোহীও।

প্রথমে দুই পড়ুয়া ও সাইকেল আরোহী-সহ তিনজনের মৃত্যুর কথা জানা যায়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হওয়ায় জেলা পুলিশের হিসাবে মৃতের সংখ্যা পাঁচে পৌঁছেছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রেল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তিনজনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে। তাই দুই কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত সংখ্যায় সাময়িক পার্থক্য রয়েছে।

কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা?

রেলের প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী, দুই দিকের ট্রেন চলাচলের জন্য রেলগেটটি বন্ধ রাখা হয়েছিল। ১৩৪৩১ নম্বর ট্রেনটি একটি লাইন দিয়ে চলে যাওয়ার পর গেট খুলে দেওয়া হয়। তখন স্কুলগাড়ি ও সাইকেল আরোহী রেললাইন পার হতে শুরু করেন। সেই সময় অন্য দিক দিয়ে আসা নিমতিতা–কাটোয়া যাত্রীবাহী ট্রেনটি স্কুলগাড়িতে ধাক্কা দেয়।

এটি রেলের দেওয়া প্রাথমিক ঘটনাক্রম। গেট খোলার আগে দ্বিতীয় ট্রেনের অবস্থান সম্পর্কে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর কাছে তথ্য পৌঁছেছিল কি না, কোনও যোগাযোগের ভুল হয়েছিল কি না এবং নিয়ম মেনে গেট পরিচালনা করা হয়েছিল কি না—এসব এখনও তদন্তাধীন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, প্রথম ট্রেনটি চলে যাওয়ার পর গেট খুলে দেওয়া হয়েছিল, যদিও অল্প সময়ের মধ্যেই দ্বিতীয় ট্রেনটির আসার কথা ছিল। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের এই বক্তব্য এখনও তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

রেলগেটকর্মী গ্রেফতার, শুরু উচ্চপর্যায়ের তদন্ত

দুর্ঘটনার পর দায়িত্বে থাকা রেলগেটকর্মীকে গ্রেফতার করেছে রাজ্য পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে গ্রেফতার হওয়ার অর্থ অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরেই তাঁর আইনি দায় নির্ধারিত হবে।

পূর্ব রেলের মহাব্যবস্থাপক উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। রেলের মুখ্য নিরাপত্তা আধিকারিকের নেতৃত্বে পরিচালন, প্রকৌশল এবং সিগন্যাল ও যোগাযোগ বিভাগের প্রবীণ আধিকারিকেরা দুর্ঘটনার কারণ পরীক্ষা করবেন। গেট খোলা ও বন্ধ করার সময়, সংশ্লিষ্ট ট্রেনের চলাচলের নথি, কর্মীদের বক্তব্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার তথ্য খতিয়ে দেখা হবে।

প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে কারও গাফিলতি নিশ্চিত ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশের পরেই বোঝা যাবে এটি একক কর্মীর ভুল, যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা, না কি একাধিক স্তরের ব্যর্থতার ফল।

আহতদের চিকিৎসা কোথায় চলছে?

দুর্ঘটনার পর আহতদের প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। গুরুতর আহতদের পরে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। বিকেল পর্যন্ত চারজন সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা গুরুতর বলে হাসপাতাল-সংক্রান্ত তথ্যে জানানো হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা শাসক ও পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল ও উদ্ধারকাজ তদারক করছেন। রাজ্যের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন।

রেল ও রাজ্য কত টাকা সাহায্য দেবে?

রেলের পক্ষ থেকে মৃতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। গুরুতর আহতদের আড়াই লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে বলে রেল সূত্রে জানানো হয়েছে।

রাজ্য সরকার মৃতদের প্রত্যেকের পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে রাজ্যের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ জানিয়েছেন। এই অর্থ তাৎক্ষণিক সহায়তা। তদন্তে কারও দায় প্রমাণিত হলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা বা ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন আলাদাভাবে বিবেচিত হতে পারে।

কোন প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও মেলেনি?

দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—দ্বিতীয় ট্রেনটি কাছে থাকা সত্ত্বেও রেলগেট কেন খুলে দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী দ্বিতীয় ট্রেনের খবর পেয়েছিলেন কি না, গেট পরিচালনার নিয়ম মানা হয়েছিল কি না এবং সিগন্যাল ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় কোনও সমস্যা ছিল কি না, তা তদন্তে নির্ধারিত হবে।

স্কুলগাড়ির চালক খোলা গেট দেখে লাইন পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে প্রাথমিক ঘটনাক্রমে জানানো হয়েছে। তবে চালকের সামনে ট্রেনটি দেখার পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল কি না, তিনি কোনও সতর্কতা পেয়েছিলেন কি না এবং দুর্ঘটনা এড়ানোর সময় ছিল কি না—এসব বিষয়ে এখনও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

রেলের তদন্ত রিপোর্ট, পুলিশের তদন্ত এবং হাসপাতালের পরবর্তী বিজ্ঞপ্তিই দুর্ঘটনার কারণ, দায় এবং আহতদের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত তথ্য দেবে।

Avatar photo

Bapan Biswas

বাপন বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। তিনি সাইটের সম্পাদকীয় পরিকল্পনা, তথ্য যাচাই এবং সংবাদ প্রকাশনার দায়িত্বে রয়েছেন। দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা ও বিনোদনের খবর সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে সহজ বাংলায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।