মেসি কি আর্জেন্টিনার রক্ষণে ফাঁক তৈরি করেন? রুনির মন্তব্যে সেমিফাইনালের আগে আলোচনা
আটলান্টা: বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে লিয়োনেল মেসিকে ঘিরে কৌশলগত পর্যবেক্ষণ সামনে এনেছেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক ওয়েন রুনি। তাঁর মতে, বল হারানোর পর মেসি নিয়মিত রক্ষণে নেমে না আসায় আর্জেন্টিনার দলগত রক্ষণে কিছুটা ফাঁক তৈরি হতে পারে। তবে মেসিকে সামগ্রিকভাবে আর্জেন্টিনার ‘দুর্বলতা’ বলেননি রুনি। বরং আক্রমণে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার দক্ষতার প্রশংসাও করেছেন।
ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল হবে ১৫ জুলাই আটলান্টায়। ভারতীয় সময় অনুযায়ী ম্যাচ শুরু হবে ১৬ জুলাই রাত ১২টা ৩০ মিনিটে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি প্রথমবার ইংল্যান্ডের সিনিয়র দলের মুখোমুখি হতে চলেছেন।
মেসি কি আর্জেন্টিনার দুর্বলতা? রুনির বক্তব্যের আসল অর্থ
এক ক্রীড়া আলোচনায় রুনি বলেন, আর্জেন্টিনা বল হারালে মেসি সাধারণত নিজের রক্ষণভাগ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে অনুসরণ করেন না। সেই জায়গাটি কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ড দ্রুত পাল্টা আক্রমণ সাজাতে পারে। তবে তাঁর বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ কৌশলগত। মেসির বয়স, খেলার ধরন এবং আক্রমণে তাঁর গুরুত্ব বিবেচনা করেই আর্জেন্টিনা তাঁকে কিছুটা স্বাধীনতা দেয়।
রুনির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মেসিকে সামলানোর ক্ষেত্রে একজন খেলোয়াড়ের উপর দায়িত্ব দিলে চলবে না। ইংল্যান্ডের রক্ষণ ও মাঝমাঠকে নিজেদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। কারণ মেসি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন না। খেলার গতি কমে এলে তিনি হঠাৎ ফাঁকা জায়গায় সরে গিয়ে আক্রমণের পথ তৈরি করেন।
অতএব, “মেসিই আর্জেন্টিনার দুর্বলতা”—এভাবে রুনির মন্তব্য তুলে ধরা পুরো বক্তব্যের সঠিক ব্যাখ্যা নয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, মেসির রক্ষণে কম অংশগ্রহণ ইংল্যান্ডের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।
ইংল্যান্ড কোন জায়গায় সুযোগ খুঁজতে পারে?
ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের মাঝমাঠের গতি ও শারীরিক সক্ষমতা। জুড বেলিংহ্যাম ও তাঁর সতীর্থেরা বল দখল হারানোর পরে দ্রুত চাপ তৈরি করতে পারেন। আর্জেন্টিনা আক্রমণে উঠে বল হারালে মেসির পিছনে তৈরি হওয়া জায়গা ব্যবহার করে ইংল্যান্ড এগোতে চাইতে পারে।
সুইৎজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার ডান দিকের রক্ষণ এবং মাঝমাঠের গতি নিয়ে কিছু সমস্যা দেখা গিয়েছিল। প্রতিপক্ষ মাঝমাঠে জায়গা সংকুচিত করায় মেসিও স্বাভাবিকভাবে বল পাননি। তা সত্ত্বেও একটি গোলের সুযোগ তৈরিতে তাঁর অবদান ছিল। ফলে তাঁকে কিছু সময় আটকে রাখা এবং পুরো ম্যাচে নিষ্ক্রিয় রাখা এক বিষয় নয়।
ইংল্যান্ডকে তাই শুধু মেসির দিকেই নজর রাখলে হবে না। তাঁকে ঘিরে থাকা হুলিয়ান আলভারেস, লাউতারো মার্তিনেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফের্নান্দেসের গতিবিধিও গুরুত্বপূর্ণ হবে। মেসিকে ঘিরে অতিরিক্ত খেলোয়াড় রাখলে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
মেসিকে আটকানো কেন এত কঠিন?
ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ফুটবলার মিকা রিচার্ডসও রুনির সঙ্গে আলোচনায় ছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ, মেসিকে চিহ্নিত করে রাখা কঠিন কারণ তিনি এমন জায়গায় চলে যান, যেখানে সাধারণত কোনও আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে আশা করা হয় না। দীর্ঘ সময় ম্যাচে তুলনামূলক শান্ত থাকার পরও সঠিক মুহূর্তে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
রিচার্ডস মনে করেন, ইংল্যান্ড দৌড় ও শারীরিক শক্তিতে আর্জেন্টিনাকে চাপে ফেলতে পারে। কিন্তু মেসির কারিগরি দক্ষতা, মাঠের ফাঁকা জায়গা বোঝার ক্ষমতা এবং ব্যক্তিত্ব এখনও আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা।
ম্যাচে কোন তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে?
প্রথমত, আর্জেন্টিনা বল হারানোর পর মেসির পাশের জায়গাটি কে সামলাচ্ছেন, সেটি দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইংল্যান্ড মাঝমাঠে দ্রুত পাস ও দৌড়ের মাধ্যমে সেই জায়গা ব্যবহার করতে পারছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, মেসি ইংল্যান্ডের মাঝমাঠ ও রক্ষণের মাঝের ফাঁকা অংশে কতবার বল পাচ্ছেন, তার উপর আর্জেন্টিনার আক্রমণের ধার অনেকটাই নির্ভর করবে।
রুনির মন্তব্য তাই অপমান বা ‘বিষোদগার’ নয়। এটি মেসিকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনার খেলার একটি পরিচিত ঝুঁকি ও সুবিধার বিশ্লেষণ। তিনি রক্ষণে কম পরিশ্রম করলেও আক্রমণে সেই ঘাটতির চেয়ে অনেক বেশি মূল্য যোগ করেন। ইংল্যান্ডের সামনে চ্যালেঞ্জ হবে—মেসির জন্য তৈরি হওয়া জায়গা কাজে লাগানো এবং একই সঙ্গে তাঁকে নিজের পছন্দের জায়গায় বল পাওয়া থেকে বিরত রাখা।
পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন অধ্যায়
বিশ্বকাপে এর আগে পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা—১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৮৬, ১৯৯৮ এবং ২০০২ সালে। ১৯৮৬ সালের দিয়েগো মারাদোনার বিখ্যাত ম্যাচ এবং ১৯৯৮ সালের বিতর্ক এই দ্বৈরথকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত লড়াইয়ে পরিণত করেছে। বিশ্বকাপে দুই দলের শেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০০২ সালে, যেখানে ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টিতে জিতেছিল ইংল্যান্ড।
এবার প্রথমবার এই ঐতিহাসিক দ্বৈরথের অংশ হতে চলেছেন মেসি। একদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে দীর্ঘদিন পর বিশ্বকাপের ফাইনালে ফেরার স্বপ্ন দেখা ইংল্যান্ড। ফলে রুনির পর্যবেক্ষণ যতই আলোচনা তৈরি করুক, মাঠে শেষ কথা বলবে দুই দলের কৌশল এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
