মোংলা ও তিস্তা ঘিরে বাংলাদেশে চিনের সক্রিয়তা, সতর্ক নজরে ভারত
বাংলাদেশে চিনের প্রভাব: বাংলাদেশে চিনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত উপস্থিতি ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মোংলা বন্দরের কাছে চিনা সংস্থার অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার পরিকল্পনা এবং তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে বেজিংয়ের আগ্রহ ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত মহলে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা BEZA মোংলা বন্দরের কাছে ১১০ একর জমিতে China-Bangladesh Mongla Port Economic Zone গড়ে তোলার জন্য চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত China Civil Engineering Construction Corporation-এর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এই জমি আগে ভারত-সমর্থিত একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল বলে জানা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন:‘মৃত্যুকে ভয় পাই না’, বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার
মোংলা বন্দর কেন গুরুত্বপূর্ণ? (বাংলাদেশে চিনের প্রভাব)
মোংলা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি শুধু বাংলাদেশের বাণিজ্যের জন্য নয়, ভারতের পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা ও বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি অবস্থান মোংলাকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আলাদা গুরুত্ব দেয়।
২০১৫ সালে ভারত ও বাংলাদেশ মোংলা এবং মিরসরাই এলাকায় ভারত-সমর্থিত অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকল্প এগোয়নি। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু না হওয়ায় আগের প্রকল্পটি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর একই এলাকায় চিনা বিনিয়োগের পথ তৈরি হয়েছে।
ভারতের উদ্বেগের মূল জায়গা এখানেই। অর্থনৈতিক অঞ্চল সরাসরি সামরিক প্রকল্প নয়। তবে কোনও বন্দর বা বন্দর-সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি উপস্থিতি থাকলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক ডেটা, জাহাজ চলাচল এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সেই দেশের প্রভাব বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ প্রকাশ করছেন।
তিস্তা প্রকল্পেও চিনা আগ্রহ
মোংলার পাশাপাশি তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, ড্রেজিং, বাঁধ মেরামত এবং নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইছে। সাম্প্রতিক ঢাকা-বেজিং আলোচনায় তিস্তা প্রকল্পে চিনা সহযোগিতার বিষয়টি আবার সামনে এসেছে।
ভারতের দৃষ্টিতে তিস্তা প্রকল্প সংবেদনশীল, কারণ এই নদী অববাহিকা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কাছাকাছি এবং শিলিগুড়ি করিডরের সঙ্গে ভৌগোলিকভাবে সম্পর্কিত। শিলিগুড়ি করিডর, যা ‘চিকেনস নেক’ নামেও পরিচিত, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ। তাই ওই অঞ্চলের আশপাশে বিদেশি প্রযুক্তিবিদ বা প্রকৌশলীদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিয়ে ভারতীয় নিরাপত্তা মহলে প্রশ্ন থাকা অস্বাভাবিক নয়।
তবে চিনের বক্তব্য, তিস্তা সহযোগিতা বাংলাদেশের জীবনযাত্রা, নদী পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ। বেজিং দাবি করেছে, এই সহযোগিতা কোনও তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে নয়।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও নজর
বাংলাদেশ ও চিনের সম্পর্ক শুধু অবকাঠামো বা বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে চিনের তৈরি J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা সামনে আসেনি।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা-বেজিং বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হলেও কোনও নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়নি। ফলে এই অংশটি এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে বলা ঠিক হবে না। বরং এটি সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি আলোচ্য বিষয় হিসেবেই দেখা উচিত।
বঙ্গোপসাগর ঘিরে বড় কৌশলগত ছবি
চিনের Belt and Road Initiative বা BRI-র অংশ হিসেবে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগর অঞ্চলে বন্দর, সড়ক, শিল্পাঞ্চল এবং লজিস্টিক প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে বেজিং। পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দর থেকে শুরু করে মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ প্রকল্প—এই ধরনের উদ্যোগকে ভারত দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত দৃষ্টিতে দেখছে।
এখন বাংলাদেশের মোংলা ও তিস্তা প্রকল্পকে ঘিরে নতুন আলোচনার কারণও সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপট। ভারতের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক সহযোগিতার আড়ালে যদি ভবিষ্যতে বন্দর, লজিস্টিক বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর চিনা প্রভাব বাড়ে, তাহলে বঙ্গোপসাগরে শক্তির ভারসাম্যে তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান হল, দেশটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা নিতে চায়। ঢাকা বারবারই জানিয়ে এসেছে, কোনও দেশের সঙ্গে সম্পর্ক অন্য দেশের বিরুদ্ধে নয়।
শেষ কথা
মোংলা বন্দরের কাছে চিনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতা এবং সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা আলোচনাকে আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখা গেলেও, সব মিলিয়ে এগুলি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারতের জন্য বিষয়টি তাই শুধু প্রতিবেশী দেশের বিনিয়োগ নীতি নয়, বরং পূর্ব সীমান্ত, বঙ্গোপসাগর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় কৌশলগত প্রশ্ন।
আগামী দিনে এই প্রকল্পগুলি কীভাবে এগোয়, বাংলাদেশ কতটা ভারসাম্য বজায় রাখে এবং ভারত কীভাবে কূটনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়—সেই দিকেই এখন নজর থাকবে।
