আন্তর্জাতিক

‘মৃত্যুকে ভয় পাই না’, বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার

প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে থাকার পর এবার সবচেয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক সাক্ষাৎকারে তিনি ঘোষণা করেছেন, চলতি বছরের শেষের আগেই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। তাঁর কথায়, “আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। কোনও ষড়যন্ত্রই আমাকে নিজের দেশে ফিরতে বাধা দিতে পারবে না।”

শেখ হাসিনার এই মন্তব্য সামনে আসতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের পর তিনি কি আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে চলেছেন, নাকি দেশে ফিরেই আইনি গ্রেফতারের মুখোমুখি হবেন?

কেন দেশের বাইরে যেতে হয়েছিল?

২০২৪ সালে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা ঘিরে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুত দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে পরিণত হয়। ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এর মধ্য দিয়েই টানা প্রায় ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তী প্রশাসনের পর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল জয় পেয়ে সরকার গঠন করে এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

আরো পড়ুন: Iran-US Conflict: হামলা থামিয়ে আলোচনায় ফেরার ইঙ্গিত, উত্তেজনা এখনও কাটেনি

মৃত্যুদণ্ডের রায় কেন?

বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিত অবস্থাতেই দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়।

এছাড়াও দুর্নীতি-সহ একাধিক ফৌজদারি মামলার তদন্তও চলছে। তবে শেখ হাসিনা এই সমস্ত মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দেশে ফিরলে কী হতে পারে?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধা নেই। তবে দেশে পৌঁছানোর পর আদালতের রায় এবং বিচারাধীন মামলাগুলির ভিত্তিতে তাঁকে অবিলম্বে গ্রেফতার করা হতে পারে। অবশ্য তাঁর আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন বা পুনর্বিচারের দাবি জানাতে পারেন।

কারণ, বেশ কয়েকটি মামলার বিচার তাঁর অনুপস্থিতিতেই সম্পন্ন হয়েছে। ফলে আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি: ফের উত্তপ্ত হতে পারে রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—এই দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপির মধ্যে কয়েক দশকের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশটির রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্য তা বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। একদিকে সরকার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলবে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে তুলে ধরতে পারে। ফলে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সমর্থকদের বিক্ষোভ এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও নজর

২০২৪ সাল থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাই তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তিনি শেষ পর্যন্ত কবে এবং কীভাবে দেশে ফিরবেন, তা নির্ভর করবে আইনি পরিস্থিতি, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের উপর। তবে তাঁর সাম্প্রতিক ঘোষণা যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *