দেশের দীর্ঘতম স্লিম্যানাবাদ জলসুড়ঙ্গের খনন শেষ, সেচের লক্ষ্য ২.৪৫ লক্ষ হেক্টর
মধ্যপ্রদেশের কাটনি জেলায় বিন্ধ্য পর্বতমালার নীচ দিয়ে তৈরি স্লিম্যানাবাদ জলসুড়ঙ্গের মূল খননকাজ শেষ হয়েছে। প্রায় ১১.৯৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গ বরগি ডাইভারশন প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নর্মদার জল পাহাড়ের অন্য দিকে বিন্ধ্য অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই তৈরি হয়েছে এই ভূগর্ভস্থ পথ।
১৪ জুলাই সুড়ঙ্গের শেষ অংশের পাথর কেটে দুই প্রান্তকে যুক্ত করেন প্রকৌশলীরা। ১৭ জুলাই প্রকল্পটি ঘুরে দেখেন মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব। রাজ্য সরকার স্লিম্যানাবাদ সুড়ঙ্গকে দেশের দীর্ঘতম ভূগর্ভস্থ জল পরিবহণ সুড়ঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে সুড়ঙ্গের খনন শেষ হওয়ার অর্থ এখনই কৃষিজমিতে জল পৌঁছনো নয়। সুড়ঙ্গের ভিতরে থাকা খননযন্ত্র খুলে বাইরে আনার পর জল ছাড়ার প্রস্তুতি শুরু হবে। একই সঙ্গে নীচের দিকের প্রধান খাল এবং জমি পর্যন্ত জল পৌঁছে দেওয়ার শাখা ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ করতে হবে।
কত বড় এই জলসুড়ঙ্গ?
স্লিম্যানাবাদ সুড়ঙ্গের সঠিক দৈর্ঘ্য ১১.৯৫২ কিলোমিটার। এর ব্যাস প্রায় ১০.১৪ মিটার। এটি বরগি ডান তীরের প্রধান খালের ১০৪তম থেকে ১১৬তম কিলোমিটারের মাঝের অংশে তৈরি হয়েছে। সুড়ঙ্গের উপরে জাতীয় সড়ক, রেললাইন, জনবসতি এবং অন্য পরিকাঠামো থাকলেও মাটির নীচ দিয়ে পথ তৈরি করা হয়েছে।
সুড়ঙ্গটি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০ থেকে ৪০ মিটার নীচে রয়েছে। নর্মদার জল এই পথে বিন্ধ্য পাহাড়ের বাধা অতিক্রম করে সোন নদীর অববাহিকামুখী এলাকায় পৌঁছবে। তবে এর অর্থ নর্মদা ও সোন নদীর মূল প্রবাহকে সরাসরি জুড়ে দেওয়া নয়। বরগি জলাধারের জল একটি পরিকল্পিত খাল ও সুড়ঙ্গব্যবস্থার মাধ্যমে অন্য অববাহিকায় পাঠানো হবে।

পাম্প ছাড়াই কীভাবে এগোবে জল?
সুড়ঙ্গটির প্রবেশমুখ এবং বেরোনোর পথের উচ্চতায় পার্থক্য রাখা হয়েছে। সেই ঢাল কাজে লাগিয়ে মাধ্যাকর্ষণের টানে জল সামনে এগোবে। ফলে দীর্ঘ সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে জল পাঠানোর জন্য নিয়মিত বড় পাম্প চালানোর প্রয়োজন হবে না।
এর সুবিধা হল, জল পরিবহণের জন্য বিদ্যুতের উপর নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম থাকবে। তবে সুড়ঙ্গের পরে খাল, জলনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ের বণ্টনব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করলেই কৃষকের জমিতে নির্ধারিত সময়ে জল পৌঁছবে।
কোন কোন জেলা উপকৃত হবে?
বৃহত্তর বরগি ডাইভারশন প্রকল্পের মাধ্যমে জবলপুর, কাটনি, মাইহার, সাতনা, রেওয়া ও পান্না জেলার প্রায় ১,৪৫০টি গ্রামের ২.৪৫ লক্ষ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচের ব্যবস্থা তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তবে ২.৪৫ লক্ষ হেক্টর হল সম্পূর্ণ বরগি ডাইভারশন প্রকল্পের লক্ষ্য। শুধু স্লিম্যানাবাদ সুড়ঙ্গের সাহায্যে কাটনি, মাইহার, সাতনা, রেওয়া ও পান্নার প্রায় ১.৮৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে ধাপে ধাপে জল পৌঁছনোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রকল্প-সংক্রান্ত তথ্যে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ সুড়ঙ্গটি পুরো সেচব্যবস্থার সবচেয়ে কঠিন অংশ হলেও একমাত্র অংশ নয়।
বিন্ধ্য অঞ্চলের বহু এলাকায় চাষ এখনও বর্ষার উপর নির্ভরশীল। নিয়মিত সেচ পৌঁছলে রবি মরসুমের চাষ, দ্বিতীয় ফসল এবং কম বৃষ্টির বছরে কৃষিকাজ ধরে রাখার সুযোগ বাড়তে পারে। কিন্তু প্রকৃত সুবিধা কতটা মিলবে, তা নির্ভর করবে জলবণ্টনের শেষ ধাপের কাজ এবং প্রতি মরসুমে জল ছাড়ার পরিমাণের উপর।

এত বছর সময় লাগল কেন?
সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে। ২০১১ সালে একটি মার্কিন নির্মিত সুড়ঙ্গ খননযন্ত্র দিয়ে মূল খনন শুরু হয়। কিন্তু শক্ত মার্বেল, চুনাপাথর, ডলোমাইট, অস্থির শিলা, মাটির নীচের ফাঁপা অংশ এবং বিপুল জল ঢুকে পড়ায় কাজ বারবার বাধার মুখে পড়ে।
প্রথম যন্ত্রটি কয়েক বছরে প্রায় ১.৪ কিলোমিটার পথ খনন করতে পেরেছিল। কাজের গতি বাড়াতে ২০১৬ সালে সুড়ঙ্গের অন্য দিক থেকে জার্মান নির্মিত আরেকটি যন্ত্র নামানো হয়। পরে দুই প্রান্ত থেকে একসঙ্গে খনন চালানো হয়।
খননের সময় কোনও অংশে প্রতি মিনিটে প্রায় ২৫ হাজার লিটার পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ জল ঢুকে পড়েছিল বলে প্রকল্পের আধিকারিকেরা জানিয়েছেন। জল বের করার জন্য উচ্চক্ষমতার ব্যবস্থা, দুর্বল মাটি শক্ত করার প্রযুক্তি এবং শিলার নমুনা পরীক্ষা করে ধাপে ধাপে এগোতে হয়েছে।
প্রকল্পে কত টাকা খরচ হয়েছে?
মধ্যপ্রদেশ সরকারের হিসাবে স্লিম্যানাবাদ সুড়ঙ্গ নির্মাণে প্রায় ১,৬০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রযুক্তিগত বাধা পেরিয়ে ২০২৬ সালে সুড়ঙ্গের কাজ গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগে এই ব্যয়কে কৃষকের কাছে পৌঁছে যাওয়া সেচসুবিধার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। প্রকল্পের সাফল্য শেষ পর্যন্ত মাপা হবে কত জমিতে নিয়মিত জল পৌঁছল, কতটি গ্রাম উপকৃত হল এবং খরার সময়ে সেই জল কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেল—তার ভিত্তিতে।
কৃষকের জমিতে জল কবে পৌঁছবে?
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রকল্পের দুটি প্রধান খাল চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। সেই কাজ হলে প্রায় এক লক্ষ হেক্টর অতিরিক্ত জমিতে সেচের সুযোগ তৈরির দাবি করেছে রাজ্য সরকার। তবে কোন তারিখে সুড়ঙ্গে প্রথম জল ছাড়া হবে এবং কোন কোন এলাকা প্রথম পর্যায়ে জল পাবে, তার পূর্ণ সময়সূচি এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
সুতরাং বর্তমান অবস্থাটি হল—সুড়ঙ্গের সবচেয়ে কঠিন খননপর্ব শেষ হয়েছে, কিন্তু জল পরিবহণের পুরো ব্যবস্থা এখনও চালু হয়নি। খননযন্ত্র সরানো, জল পরীক্ষা, প্রধান খাল এবং মাঠের বণ্টনব্যবস্থা শেষ হওয়ার পরেই প্রকল্পের সুবিধা ধাপে ধাপে কৃষকদের কাছে পৌঁছবে।
