অনশনের ২১তম দিনে সাফদরজং হাসপাতালে সোনম ওয়াংচুক, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে
পরীক্ষা পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে চলা আন্দোলনের মধ্যে অনশনের ২১তম দিনে হাসপাতালে ভর্তি করা হল সমাজকর্মী ও শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুককে। শনিবার, ১৮ জুলাই সকালে দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থল থেকে তাঁকে সাফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘ অনশন এবং শরীরে জলের ঘাটতির কারণে ওয়াংচুক দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তবে বর্তমানে তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল। শরীরের প্রয়োজনীয় মাত্রাগুলি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোর জন্য তাঁকে একটানা পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার মধ্যে রাখা হয়েছে।
৫৯ বছর বয়সি ওয়াংচুক গত ২৮ জুন থেকে অনশন করছিলেন। পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP যে আন্দোলন শুরু করেছে, তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি যন্তর মন্তরে অনশনে বসেছিলেন।
কেন হাসপাতালে নেওয়া হল ওয়াংচুককে?
ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর বিষয়টি দিল্লি হাইকোর্টে পৌঁছয়। একটি আবেদনে তাঁর জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে জোর করে খাবার বা তরল দেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়েছিল।
আদালত অবশ্য সরাসরি জোর করে খাওয়ানোর কোনও নির্দেশ দেয়নি। কেন্দ্র ও দিল্লি প্রশাসনকে প্রতিদিন তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছিল। আদালত জানিয়েছিল, তাঁর জীবন রক্ষায় প্রশাসনকে যথাসম্ভব পদক্ষেপ করতে হবে।
দিল্লি পুলিশের উপকমিশনার সচিন শর্মার বক্তব্য, আদালতের নির্দেশ, ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ বিবেচনা করেই তাঁকে সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তির পর তিনি সচেতন ছিলেন এবং তাঁর গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচক স্থিতিশীল ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়।
পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের বক্তব্য আলাদা
ওয়াংচুককে আন্দোলনস্থল থেকে সরানোর সময় যন্তর মন্তরে বহু পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন ছিলেন। পুলিশ সেখানে অবস্থানরত অন্য আন্দোলনকারীদেরও জায়গাটি খালি করতে বলে। কয়েকজনকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যও প্রকাশ্যে এসেছে।
CJP-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের অভিযোগ, ওয়াংচুকের সম্মতি ছাড়াই তাঁকে আন্দোলনস্থল থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলনকারীদের একাংশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও সংযমের সঙ্গে গোটা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
অর্থাৎ ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে—এই তথ্য নিশ্চিত। কিন্তু তাঁকে সরানোর সময় কতটা বলপ্রয়োগ হয়েছিল, তা নিয়ে পুলিশ এবং আন্দোলনকারীদের বক্তব্য এক নয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই বা কোনও তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে আংমো জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্য এবং গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা চিকিৎসকদের সম্মতি ছাড়া তাঁকে মুখে বা শিরায় কোনও কিছু দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, শুক্রবার ওয়াংচুকের অবস্থা এমন ছিল না যে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। এটি পরিবারের বক্তব্য; হাসপাতাল জানিয়েছে, দীর্ঘ অনশন ও জলশূন্যতার কারণে তাঁর নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন।
কী নিয়ে এই আন্দোলন?
CJP-র অভিযোগ, NEET-UG-সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরিচালনাগত অনিয়মের কারণে বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংগঠনটি পরীক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন, অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে। ধর্মেন্দ্র প্রধান বর্তমানে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।
মে মাসে অনুষ্ঠিত একটি প্রধান মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা পরে বাতিল করে নতুন করে আয়োজন করা হয়। প্রায় ২৩ লক্ষ পরীক্ষার্থী ওই পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই ঘটনার পর পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ব নির্ধারণের দাবিতে পড়ুয়া ও চাকরিপ্রার্থীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ে।
তবে আন্দোলনকারীদের তোলা প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং মন্ত্রীর ব্যক্তিগত দায় সংক্রান্ত দাবিগুলি অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা প্রয়োজন। তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কোনও ব্যক্তিকে দায়ী বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
২০ জুলাইয়ের কর্মসূচি কি হবে?
CJP জানিয়েছে, পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে মিছিলের পরিকল্পনা রয়েছে। ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়ার পর অভিজিৎ দীপক নিজেও অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করার কথা জানিয়েছেন।
ওয়াংচুক হাসপাতালে থাকলেও সংগঠনটি এখনও মিছিল প্রত্যাহারের কথা জানায়নি। তবে কর্মসূচির অনুমতি, যাত্রাপথ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিস্তারিত সরকারি ঘোষণা সামনে আসেনি।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর পরবর্তী স্বাস্থ্যবিবৃতি। হাসপাতাল থেকে কবে ছাড়া হবে, তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন কি না এবং চিকিৎসার বিষয়ে তাঁর ও পরিবারের সিদ্ধান্ত কী হবে—তা এখনও স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে ২০ জুলাইয়ের কর্মসূচি ঘিরে প্রশাসন কী অবস্থান নেয়, সেদিকেও নজর থাকবে।
