শেষ মুহূর্তে আবার মেরিনো, বেলজিয়ামকে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন
ইঙ্গলউড: বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন ম্যাচের শেষ দিকে। গোল করতে সময় নিলেন মাত্র দু’মিনিট। মিকেল মেরিনোর ৮৮ মিনিটের গোলে বেলজিয়ামকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠল স্পেন।
এর আগে প্রথমার্ধে ফাবিয়ান রুইসের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল স্প্যানিশরা। বিরতির আগেই চার্লস দে কেটেলারে বেলজিয়ামকে সমতায় ফেরান। দীর্ঘ সময় ম্যাচ ১-১ থাকার পর আবারও স্পেনের ত্রাতা হয়ে ওঠেন মেরিনো। শেষ ষোলোয় পর্তুগালের বিরুদ্ধেও বদলি হিসেবে নেমে সংযুক্ত সময়ে জয়সূচক গোল করেছিলেন তিনি।
এই জয়ের ফলে ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জেতার পর প্রথমবার শেষ চারে পৌঁছল স্পেন। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ফ্রান্স।
শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ স্পেনের
ম্যাচের শুরু থেকে বলের দখল রেখে বেলজিয়ামের রক্ষণকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে স্পেন। পেদ্রিকে প্রথম একাদশে না রেখে ফাবিয়ান রুইসকে শুরু থেকে খেলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
সেই সিদ্ধান্তের ফল মেলে ৩০ মিনিটে। মাঝমাঠ থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে বেলজিয়ামের রক্ষণে জায়গা তৈরি হলে গোল করে স্পেনকে এগিয়ে দেন ফাবিয়ান। তাঁর উপস্থিতি স্পেনের মাঝমাঠে বলের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি আক্রমণের সময় অতিরিক্ত একজন খেলোয়াড় যোগ করেছিল।
তবে বেলজিয়াম দ্রুত ম্যাচে ফিরে আসে। ৪১ মিনিটে চার্লস দে কেটেলারে গোল করে ব্যবধান সমান করেন। চলতি বিশ্বকাপে এটিই ছিল স্পেনের জালে প্রথম গোল। এর আগে প্রতিযোগিতার কোনও ম্যাচে গোল খায়নি দে লা ফুয়েন্তের দল।
চোটে বিপাকে বেলজিয়াম
ম্যাচ শুরুর আগেই ধাক্কা খেয়েছিল বেলজিয়াম। অনুশীলনের সময় পেশিতে চোট পাওয়ায় অধিনায়ক ইউরি তিলেমানস প্রথম একাদশ থেকে ছিটকে যান। তাঁর জায়গায় খেলানো হয় হান্স ভানাকেনকে এবং অধিনায়কের দায়িত্ব নেন কেভিন দে ব্রুইন।
দ্বিতীয়ার্ধে বেলজিয়ামের সমস্যা আরও বাড়ে। পায়ে অস্বস্তির কারণে গোলরক্ষক থিবো কুর্তোয়াকে মাঠ ছাড়তে হয়। তাঁর পরিবর্তে নামেন সেন্নে লামেন্স।
কুর্তোয়া মাঠে থাকা অবস্থায় স্পেনের বেশ কয়েকটি আক্রমণ সামলেছিলেন। তাঁর বিদায়ের পরে বেলজিয়ামের রক্ষণে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা যায়। যদিও হারের পুরো দায় বদলি গোলরক্ষকের উপর চাপানো ঠিক হবে না; শেষ পর্যন্ত স্পেনের ধারাবাহিক চাপই ম্যাচের ব্যবধান তৈরি করে।
আবারও বদলি মেরিনোর গোল
ম্যাচের ৮৬ মিনিটে মাঠে নামেন মিকেল মেরিনো। তখনও ফল ১-১। দুই মিনিটের মধ্যেই ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন তিনি।
কুবার্সির নিচু প্রচেষ্টা ধরে রাখতে পারেননি বদলি গোলরক্ষক লামেন্স। সামনে চলে আসা বল দ্রুত জালে পাঠান মেরিনো। সামনে চলে আসা বল দ্রুত জালে পাঠান মেরিনো। বেলজিয়ামের খেলোয়াড়েরা সামলে ওঠার আগেই স্পেন এগিয়ে যায় ২-১ ব্যবধানে।
পর্তুগালের বিরুদ্ধে শেষ ষোলোর ম্যাচেও একইভাবে শেষ দিকে মাঠে নেমে জয়সূচক গোল করেছিলেন মেরিনো। বিশ্বকাপের আলাদা দুটি নকআউট ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে জয়সূচক গোল করা প্রথম ফুটবলার হয়েছেন তিনি বলে ম্যাচ-পরবর্তী পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে।
মেরিনোর এই ভূমিকা শুধু গোলের সংখ্যায় বিচার করলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। তিনি মাঠে নামার পর স্পেন আকাশপথে বল দখল, দ্বিতীয় বল সংগ্রহ এবং বক্সের ভিতরে শারীরিক উপস্থিতি—তিন ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধা পায়।
দে লা ফুয়েন্তের বদলির সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
স্পেনের প্রথম একাদশে জায়গা না পেলেও মেরিনো বারবার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে সাহায্য করছেন। কোচ দে লা ফুয়েন্তে ম্যাচের পরে দলের গভীরতা এবং বদলি খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতির প্রশংসা করেন।
তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, প্রথম একাদশে না থাকা মানেই কোনও ফুটবলারের গুরুত্ব কমে যাওয়া নয়। মেরিনোর গোল সেই কথার বাস্তব উদাহরণ। বদলি খেলোয়াড়দের কার্যকর ভূমিকা বড় প্রতিযোগিতার নকআউট পর্বে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, স্পেনের শেষ দুই ম্যাচে সেটি স্পষ্ট হয়েছে।
একই সঙ্গে এই ম্যাচ দেখিয়েছে, শুধু তরুণ আক্রমণভাগের উপর স্পেন নির্ভর করছে না। প্রয়োজনের সময় অভিজ্ঞ এবং বহুমুখী খেলোয়াড়দের ব্যবহার করে ম্যাচের ধরন বদলে দেওয়ার সুযোগও তাদের রয়েছে।
বেলজিয়ামের হারের কারণ কোথায়?
বেলজিয়াম ম্যাচের বড় অংশে স্পেনকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল। দে কেটেলারের গোল ছাড়াও জেরেমি ডোকু, দে ব্রুইন এবং রোমেলু লুকাকু কয়েকটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেন।
কিন্তু অধিনায়ক তিলেমানসের অনুপস্থিতি এবং দ্বিতীয়ার্ধে কুর্তোয়ার চোট তাদের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলে। শেষ দিকে লুকাকুর সামনে সুযোগ এলেও সমতা ফেরানো যায়নি।
তার পরেও বেলজিয়ামের পারফরম্যান্সকে একতরফা ব্যর্থতা বলা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর স্পেনের বিরুদ্ধেও তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে।
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে কী পরীক্ষা অপেক্ষা করছে?
সেমিফাইনালে স্পেনের সামনে ফ্রান্স। মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ চারে পৌঁছেছে দিদিয়ের দেশঁর দল। দুই দলের আক্রমণের ধরন আলাদা হলেও বল দখল, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত আক্রমণ তৈরির ক্ষমতা রয়েছে উভয়েরই।
স্পেনের জন্য বিশেষ চিন্তার জায়গা হবে কিলিয়ান এমবাপে ও উসমান দেম্বেলের গতি। অন্যদিকে ফ্রান্সকে সামলাতে হবে লামিনে ইয়ামাল, ফাবিয়ান রুইস এবং স্পেনের ধারাবাহিক বলের আদানপ্রদান।
বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে গোল খেলেও স্পেনের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা লাগেনি। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে তাদের অপরাজিত যাত্রাও অব্যাহত রয়েছে। তবে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সামান্য ভুলের মূল্য আরও বেশি হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই জয়?
স্পেনের জয় শুধু সেমিফাইনালের টিকিট পাওয়ার ঘটনা নয়। ২০১০ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর দীর্ঘ ১৬ বছর তারা এই পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি।
বর্তমান দলটিতে তরুণ প্রতিভা, অভিজ্ঞ মাঝমাঠ এবং প্রয়োজনের সময় ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো বদলি খেলোয়াড়—তিনটিরই ভারসাম্য দেখা যাচ্ছে। বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চাপ ধরে রাখার ক্ষমতা সেই শক্তির প্রমাণ।
তবে শিরোপার পথে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা এখনও বাকি। ফ্রান্সকে হারাতে হলে শুধু বলের দখল নয়, গোলের সুযোগ কাজে লাগানো এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণ সামলানোয়ও স্পেনকে নিখুঁত হতে হবে।
