রাজ্য

সোমবার থেকে ‘গুণ্ডা দমন আইন’ কার্যকর, ইউসিসি কমিটি নিয়েও বার্তা শুভেন্দুর

বহরমপুর: আগামী সোমবার, ১৩ জুলাই থেকে পশ্চিমবঙ্গে নতুন ‘গুণ্ডা দমন আইন’ কার্যকর হবে বলে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার মুর্শিদাবাদ সফরে প্রশাসনিক বৈঠকের পর রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই ঘোষণা করেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিধানসভায় পাশ হওয়া সংশ্লিষ্ট বিলগুলিতে রাজ্যপালের সম্মতি মিলেছে। নতুন আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধ, তোলাবাজি, হিংসা এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্টের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

একই সঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসির খসড়া পরীক্ষা করতে গঠিত কমিটির কথাও সামনে এসেছে। ওই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাই। কমিটিকে চার সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।

‘গুণ্ডা দমন আইন’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?

‘গুণ্ডা দমন আইন’ কোনও আনুষ্ঠানিক আইনি নাম নয়। রাজনৈতিক আলোচনা ও সংবাদ প্রতিবেদনে মূলত দুটি নতুন আইনি ব্যবস্থাকে এই নামে উল্লেখ করা হচ্ছে।

প্রথমটি হল পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬। দ্বিতীয়টি পশ্চিমবঙ্গ জনশৃঙ্খলা রক্ষা সংশোধনী বিল, ২০২৬। গত ২৯ জুন বিধানসভায় বিল দুটি পাশ হয়। পক্ষে ১৭৬টি এবং বিপক্ষে ৪১টি ভোট পড়ে। ২০ জন বিধায়ক ভোটদানে বিরত ছিলেন। সরকারের বক্তব্য, সংগঠিত অপরাধ, ধারাবাহিক সমাজবিরোধী কার্যকলাপ এবং হিংসার ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতেই নতুন আইনি কাঠামো আনা হয়েছে।

নতুন আইনে কী ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে?

জননিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনে প্রতিরোধমূলক আটক, নির্দিষ্ট এলাকা থেকে কোনও ব্যক্তিকে দূরে রাখার নির্দেশ এবং অপরাধের সঙ্গে যুক্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে কোনও ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১২ মাস প্রতিরোধমূলক আটকে রাখা যেতে পারে। এই আটক সাধারণ ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার শাস্তি নয়; সম্ভাব্য সমাজবিরোধী কার্যকলাপ ঠেকানোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে আইনে এটি রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কোনও জেলা বা এলাকা থেকে দূরে থাকার নির্দেশও দেওয়া যেতে পারে। জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার এবং নির্দিষ্ট পদমর্যাদার পুলিশ আধিকারিকদের এই আইনের অধীনে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়ার বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে জনশৃঙ্খলা রক্ষা সংশোধনী আইনে হিংসা, অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের ঘটনায় সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতির টাকা আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ক্ষতির জন্য দায়ী বলে নির্ধারিত ব্যক্তি বা সংগঠনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের পথ তৈরি করাই এর লক্ষ্য। তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তিনি দোষী হয়ে যান না। ব্যক্তিগত দায়, ক্ষতির পরিমাণ এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

অপব্যবহারের আশঙ্কাও রয়েছে

সরকার নতুন আইনকে জননিরাপত্তা এবং সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় বলে দাবি করেছে। তবে বিরোধী দল ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলির একাংশ কয়েকটি ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বিচার শুরুর আগে দীর্ঘ সময় আটক, কোনও এলাকা থেকে বহিষ্কার এবং প্রশাসনের হাতে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, যথাযথ নজরদারি না থাকলে রাজনৈতিক বিরোধিতা অথবা সাধারণ প্রতিবাদের ক্ষেত্রেও এই ক্ষমতার অপব্যবহার হতে পারে। আইন কার্যকর হওয়ার পর আটক, বহিষ্কার বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার কোনও সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলির বাস্তব প্রয়োগ এবং আইনি সীমা আরও স্পষ্ট হবে।

ইউসিসি কমিটির কাজ কী?

অভিন্ন দেওয়ানি বিধির খসড়া পরীক্ষা করতে রাজ্য মন্ত্রিসভা একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি অনুমোদন করেছে। পাঁচ সদস্যের ওই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাই। কমিটিতে একজন অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক, একজন আইন বিশেষজ্ঞ, একজন শিক্ষাবিদ এবং একজন সমাজকর্মী থাকবেন। রাজ্যের সাধারণ প্রশাসন বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব সদস্য-সচিব হিসেবে প্রশাসনিক সমন্বয়ের কাজ করবেন। কমিটিকে চার সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।

বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, দত্তক, উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি পাওয়া এবং সহবাসের মতো বিষয়গুলি পর্যালোচনা করা হবে। রাজ্যে বর্তমানে চালু বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতিনীতিও খতিয়ে দেখবে কমিটি। প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত নেওয়া হতে পারে। কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর খসড়া বিলটি চূড়ান্ত করে বিধানসভায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে এখনই পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি চালু হয়ে গিয়েছে—এমন ধারণা ঠিক নয়।

জনজাতিদের ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব

মুখ্যমন্ত্রী আগেই জানিয়েছেন, আদিবাসী, কুর্মি এবং অন্যান্য স্বীকৃত জনজাতি ও মূলবাসী গোষ্ঠীকে প্রস্তাবিত ইউসিসির আওতার বাইরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এটি এখনও প্রস্তাবিত ব্যবস্থার অংশ। কমিটির রিপোর্ট এবং চূড়ান্ত বিল প্রকাশের পরেই কারা আইনের আওতায় থাকবেন এবং কোন গোষ্ঠী ছাড় পাবে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যাবে।

মুর্শিদাবাদের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নির্দেশ

বহরমপুরের প্রশাসনিক বৈঠকে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় নারী পাচার রুখতে পুলিশ ও প্রশাসনকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। হিংসা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, ট্রেন বা বাসে আগুন দেওয়া এবং পুলিশের ওপর হামলার মতো ঘটনা বরদাস্ত করা হবে না বলেও জানান তিনি। পুলিশ বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে সরাসরি তাঁকে জানানোর কথা বলেন শুভেন্দু। একই সঙ্গে থানার সামনে ভিড় করে হুমকি দেওয়া অথবা উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা না করার বার্তাও দেন তিনি। সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও রাজ্য পুলিশের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং নারী পাচার প্রতিরোধেও বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঘোষণা?

নতুন আইন কার্যকর হলে সংগঠিত অপরাধ ও হিংসার ঘটনা মোকাবিলায় রাজ্য পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা আসবে। পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, প্রতিরোধমূলক আটক এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়েও বিতর্ক চলবে।

অন্যদিকে ইউসিসি কমিটির রিপোর্ট রাজ্যের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে রিপোর্ট, খসড়া বিল, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত এবং বিধানসভার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি প্রস্তাবের স্তরেই থাকবে।

Moumita Biswas

মৌমিতা বিশ্বাস স্টারফ্লিক্স বাংলা নিউজের সংবাদলেখক ও সম্পাদকীয় দলের সদস্য। তিনি দেশ, রাজ্য, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, বিনোদন ও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করে সহজ ও স্বাভাবিক বাংলায় তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরাই তাঁর লক্ষ্য। প্রকাশিত কোনও তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ হলে সংশোধন নীতি অনুযায়ী তা দ্রুত সংশোধন করা হয়।