রাজস্ব-মুনাফা প্রত্যাশার নিচে, পরের ত্রৈমাসিকেও দুর্বল পূর্বাভাস উইপ্রোর
জুনে শেষ হওয়া ত্রৈমাসিকে উইপ্রোর রাজস্ব ও নিট মুনাফা বাজারের গড় পূর্বাভাস ছুঁতে পারেনি। বার্ষিক হিসাবে মোট রাজস্ব বাড়লেও, সংস্থার মূল তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা ব্যবসায় ত্রৈমাসিক বৃদ্ধির গতি দুর্বল থেকেছে। সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকের জন্য দেওয়া পূর্বাভাসেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলেনি।
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে উইপ্রোর মোট রাজস্ব হয়েছে ২৪,৪৭৮ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা। এক বছর আগের তুলনায় তা ১০.৬ শতাংশ এবং আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ১ শতাংশ বেশি। তবে বাজার বিশ্লেষকদের গড় পূর্বাভাস ছিল প্রায় ২৪,৭৭৬ কোটি টাকা।
সংস্থার শেয়ারহোল্ডারদের প্রাপ্য নিট মুনাফা হয়েছে ৩,৩৫২ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মুনাফা ০.৬ শতাংশ বাড়লেও, তা প্রায় ৩,৪৪২ কোটি টাকার বাজার প্রত্যাশার নিচে রয়েছে। আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় নিট মুনাফা কমেছে ৪.৭ শতাংশ।
মূল তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায় বৃদ্ধির গতি কেমন?
জুন ত্রৈমাসিকে উইপ্রোর তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা ব্যবসা থেকে ২৬১ কোটি ৪৫ লক্ষ ডলার রাজস্ব এসেছে। ঘোষিত বিনিময় হারে এই রাজস্ব এক বছর আগের তুলনায় ১ শতাংশ বাড়লেও, আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ১.৪ শতাংশ কমেছে।
বিনিময় হারের ওঠানামার প্রভাব বাদ দিলে তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা ব্যবসার রাজস্ব বার্ষিক হিসাবে মাত্র ০.৯ শতাংশ বেড়েছে। আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় তা ১.২ শতাংশ কমেছে। ফলে মোট রাজস্বের বার্ষিক বৃদ্ধি শক্তিশালী দেখালেও, সংস্থার প্রধান পরিষেবা ব্যবসায় এখনও ধারাবাহিক বৃদ্ধির ছবি স্পষ্ট নয়।
সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকের জন্য কী পূর্বাভাস?
৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা ব্যবসা থেকে ২৫৭ কোটি ৪০ লক্ষ থেকে ২৬২ কোটি ৭০ লক্ষ ডলার রাজস্ব আসতে পারে বলে জানিয়েছে উইপ্রো।
স্থির বিনিময় হারে এর অর্থ, জুন ত্রৈমাসিকের তুলনায় রাজস্ব ১.৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে অথবা সর্বোচ্চ ০.৫ শতাংশ বাড়তে পারে। বাজার বিশ্লেষকেরা ১ শতাংশ পতন থেকে ১ শতাংশ বৃদ্ধির মধ্যে পূর্বাভাস আশা করেছিলেন। ফলে উইপ্রোর দেওয়া সীমার উপরের দিকটিও প্রত্যাশার তুলনায় কম।
এই পূর্বাভাস কোনও নিশ্চিত ফল নয়। গ্রাহকদের প্রযুক্তি ব্যয়, নতুন প্রকল্প শুরু হওয়ার সময় এবং বড় চুক্তিগুলি কত দ্রুত রাজস্বে পরিণত হচ্ছে, তার উপর প্রকৃত ফল নির্ভর করবে।
মোট চুক্তির মূল্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ত্রৈমাসিকে উইপ্রোর মোট চুক্তির মূল্য ছিল ৩৩৭ কোটি ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৪৯৭ কোটি ১০ লক্ষ ডলার। আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় স্থির বিনিময় হারে মোট চুক্তির মূল্যও ২.৪ শতাংশ কমেছে।
মোট চুক্তির মধ্যে নতুন কাজ, পুরনো চুক্তির নবীকরণ এবং চলতি চুক্তির পরিধি বৃদ্ধির অঙ্ক অন্তর্ভুক্ত থাকে। পুরো মূল্য একটি ত্রৈমাসিকেই রাজস্ব হিসাবে আসে না; চুক্তির মেয়াদ অনুযায়ী ধাপে ধাপে আয় হয়। তাই মোট চুক্তির পতন মানেই তাৎক্ষণিক ভাবে একই হারে রাজস্ব কমে যাওয়া নয়। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাব্য ধারায় চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, ৩ কোটি ডলার বা তার বেশি মূল্যের বড় চুক্তির অঙ্ক আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ১২.৯ শতাংশ বেড়ে ১৬২ কোটি ৬০ লক্ষ ডলার হয়েছে। প্রথম ত্রৈমাসিকে এমন ১৩টি বড় চুক্তি পেয়েছে সংস্থা। মোট চুক্তি কমলেও বড় চুক্তির এই বৃদ্ধি কিছুটা ইতিবাচক দিক।
কোন বাজার ও ব্যবসায় চাপ বেশি?
উইপ্রোর রাজস্বের বড় অংশ আসে আমেরিকার বাজার থেকে। জুন ত্রৈমাসিকে ‘আমেরিকাস ১’ ব্যবসার রাজস্ব স্থির বিনিময় হারে আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ২.৩ শতাংশ কমেছে। ‘আমেরিকাস ২’ ব্যবসায় পতন হয়েছে ২.৫ শতাংশ। বার্ষিক হিসাবে ‘আমেরিকাস ২’-এর রাজস্ব ৭.৩ শতাংশ কমেছে।
সংস্থার মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক শ্রীনি পাল্লিয়া জানিয়েছেন, কয়েকটি নির্দিষ্ট গ্রাহক-সংক্রান্ত সমস্যা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যয় কমার প্রভাব আমেরিকার ব্যবসায় পড়েছে। তবে কোন গ্রাহক বা প্রকল্পে কতটা প্রভাব পড়েছে, সেই বিষয়ে সংস্থা বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।
স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রের রাজস্ব স্থির বিনিময় হারে আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ২.৬ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় ৩ শতাংশ কমেছে। শক্তি, উৎপাদন ও প্রাকৃতিক সম্পদ-সংক্রান্ত ব্যবসাতেও বার্ষিক পতন হয়েছে।
তবে সব বাজারের ছবি এক নয়। স্থির বিনিময় হারে ইউরোপের রাজস্ব বার্ষিক হিসাবে ৬ শতাংশ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের রাজস্ব ১৩.৫ শতাংশ বেড়েছে।
কমেছে পরিচালন মুনাফার হার
তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা ব্যবসায় উইপ্রোর পরিচালন মুনাফার হার কমে ১৬ শতাংশ হয়েছে। আগের ত্রৈমাসিকে এই হার ছিল ১৭.৩ শতাংশ এবং এক বছর আগে ছিল ১৭.২ শতাংশ।
বেতন বৃদ্ধি এবং একাধিক বড় চুক্তির কাজ শুরু করার প্রাথমিক খরচের কারণে মুনাফার হারে চাপ পড়েছে। সংস্থার মুখ্য আর্থিক আধিকারিক অপর্ণা আইয়ার জানিয়েছেন, কর্মী এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যবসায় বিনিয়োগের কারণে স্বল্পমেয়াদে মুনাফার হারে ওঠানামা হতে পারে।
তবে নগদ প্রবাহের দিক থেকে সংস্থা তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ত্রৈমাসিকে পরিচালন নগদ প্রবাহ ছিল ৩,২৯০ কোটি টাকা, যা নিট মুনাফার ৯৮ শতাংশের সমান। উইপ্রোর পরিচালন পর্ষদ প্রতি শেয়ারে ২ টাকা অন্তর্বর্তী লভ্যাংশও ঘোষণা করেছে।
বিনিয়োগকারী ও তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের জন্য এর তাৎপর্য
একই ত্রৈমাসিকে টিসিএস, এইচসিএলটেক এবং টেক মাহিন্দ্রার রাজস্ব বাজারের পূর্বাভাস অতিক্রম করেছে। সেই তুলনায় উইপ্রোর আয়, মুনাফা ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস দুর্বল হওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় সংস্থার পুনরুদ্ধারের গতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফল প্রকাশের পর মার্কিন প্রাক-বাজার লেনদেনে উইপ্রোর শেয়ার-প্রতিনিধিত্বকারী এডিআরের দাম এক পর্যায়ে ২.২ শতাংশ পর্যন্ত নেমেছিল।
উইপ্রোর ফল ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের বৃহত্তর চাহিদার ছবিও তুলে ধরে। বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা অপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যয় কমাচ্ছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কম খরচে বেশি কাজ করানোর চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে বড় চুক্তি পেলেও তা কত দ্রুত লাভজনক রাজস্বে পরিণত হচ্ছে, সেটিই তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পরবর্তী ত্রৈমাসিকের ফলাফলে মোট চুক্তি থেকে বাস্তব রাজস্ব আসার গতি, আমেরিকার ব্যবসায় পতন থামছে কি না এবং পরিচালন মুনাফার হার ১৬ শতাংশ থেকে ফের উন্নত হচ্ছে কি না—এসবের ভিত্তিতেই উইপ্রোর পুনরুদ্ধারের গতি আরও পরিষ্কার হবে।
